ঘড়িতে তখন ভোর চারটে। বাইরে অন্ধকার। বাড়ির অন্য ঘরগুলোয় আলো জ্বলেনি। পুরোনো রেডিওর খসখস শব্দ পেরিয়ে হঠাৎ ভেসে আসে একটি কণ্ঠ। তারপর শঙ্খধ্বনি, সংস্কৃত স্তোত্র, চেনা সুর।
ঘুম ভাঙে। কারও শৈশব ফিরে আসে। কেউ মনে মনে খোঁজেন সেই মানুষটিকে, যিনি একসময় এই ভোরে তাঁকে ডেকে তুলতেন।
বাঙালির কাছে মহালয়া এমনই এক সকাল। ধর্মীয় আচার আছে, পূর্বপুরুষকে স্মরণের প্রথা আছে, দেবী দুর্গার আগমনের অপেক্ষাও আছে। কিন্তু সেই সঙ্গে আছে আরও একটি ইতিহাস, যা আমরা অনেকেই জানি না।
যে কণ্ঠ ছাড়া আজ মহালয়ার কথা ভাবা যায় না, একসময় সেই কণ্ঠ নিয়েই আপত্তি উঠেছিল। কারণ, মানুষটি ব্রাহ্মণ ছিলেন না। যে সংগীত এই অনুষ্ঠানকে পূর্ণতা দিয়েছে, তার পেছনে ছিলেন হিন্দু-মুসলমানসহ নানা ধর্মীয় পরিচয়ের শিল্পীরা।
আর একবার সেই পরিচিত অনুষ্ঠান সরিয়ে দেওয়া হলে প্রতিবাদ করেছিলেন সাধারণ শ্রোতারা।
এ কারণেই মহালয়া কেবল একটি ধর্মীয় দিনের স্মৃতি হয়ে থাকেনি। তার বেতার-ইতিহাসে জড়িয়ে আছে বাঙালির বহু পরিচয়ের মানুষের কাজ, ভালোবাসা ও প্রতিবাদ।
মহালয়া ২০২৬ পড়েছে শনিবার, ১০ অক্টোবর। দুর্গাপূজা ২০২৬ শুরু হওয়ার আগে সেই পরিচিত ভোর আবার ফিরে আসছে।
এবার সেই কণ্ঠ শোনার পাশাপাশি তার পেছনের মানুষগুলোকেও একটু মনে করা যাক।
মহালয়ার ভোরে যাঁদের হারিয়েছি, তাঁদেরও মনে পড়ে
আশ্বিনের অমাবস্যা। নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে কেউ দুই হাতে জল তুলে নিচ্ছেন। হয়তো তাঁর বাবা নেই, মা নেই। কিংবা দাদু-দিদিমার মুখ এখন আর স্পষ্ট মনে পড়ে না। তবু তাঁদের উদ্দেশে জল দেওয়ার আচারটি রয়ে গেছে।
এই হলো তর্পণ।
হিন্দুধর্মে পিতৃপক্ষের সময় প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা হয়। প্রায় পনেরো দিনের এই পর্ব শেষ হয় মহালয়ার অমাবস্যায়। অনেক পরিবারে সেদিন শ্রাদ্ধ ও তর্পণের মাধ্যমে মৃত আত্মীয়দের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।
স্মরণ করার এই রীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবারের নিজস্ব ইতিহাস। কারও কাছে এটি ধর্মীয় কর্তব্য। কারও কাছে দীর্ঘদিনের পারিবারিক অভ্যাস। কেউ হয়তো বাবার হাত ধরে প্রথম গিয়েছিলেন নদীর ঘাটে। বহু বছর পরে সেখানে দাঁড়ান নিজের সন্তানকে নিয়ে।
মহালয়ার পর শুরু হয় দেবীপক্ষের উৎসবমুখর দিনগুলো। বাঙালি হিন্দুর বিশ্বাসে দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমনের বার্তা আসে এই সময়ে। দুর্গাপূজার প্রস্তুতিও তখন নতুন গতি পায়।
কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীর হাতে এত দিন যে প্রতিমার অবয়ব তৈরি হচ্ছিল, তাতে বসে শেষ তুলির টান। মহালয়ার সঙ্গে প্রতিমার চোখ দান বা চক্ষুদানের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। যদিও সব শিল্পী বা সব কর্মশালায় কাজটি ঠিক সেই দিনেই সম্পন্ন হয় না।
মাটির মুখে চোখ আঁকার এই মুহূর্তটিকে ঘিরে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি দীর্ঘ শিল্প-ঐতিহ্যও গড়ে উঠেছে।
তাই মহালয়ার সকালে নদীর ঘাটে যে মানুষটি প্রয়াত বাবার জন্য জল দিচ্ছেন, কয়েক দিন পর তিনিই হয়তো সন্তানকে নিয়ে প্রতিমা দেখতে বেরোবেন।
এই দিনের মধ্যে স্মৃতির জায়গা আছে। অপেক্ষারও।
তবে বাঙালির ঘরে মহালয়ার ভোরকে যে অনুষ্ঠান এত গভীরভাবে জায়গা করে দিয়েছে, তার জন্মের ইতিহাস কিন্তু মোটেও নির্বিবাদ ছিল না।
মহালয়ার যে কণ্ঠকে একসময় মেনে নিতে চাননি অনেকে
আজ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ শুনতে কাউকে আলাদা করে বোঝাতে হয় না। তাঁর কণ্ঠ এতটাই পরিচিত যে বহু মানুষের কাছে সেটিই মহালয়ার প্রথম পরিচয়।
অথচ সেই কণ্ঠকে ঘিরেই একদিন প্রশ্ন উঠেছিল।
প্রথমে মানুষটিকে জানা দরকার।
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র (১৯০৫–১৯৯১) ছিলেন কলকাতার বেতারশিল্পী, নাট্যকার, অভিনেতা ও আবৃত্তিকার। বাঙালির মহালয়ার ভোরে শোনা ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ অনুষ্ঠানে তাঁর সংস্কৃত স্তোত্রপাঠ ও বাংলা ভাষ্য তাঁকে ঘরে ঘরে পরিচিত করে। বাণী কুমারের রচনা এবং পঙ্কজ কুমার মল্লিকের সংগীতের সঙ্গে তাঁর কণ্ঠ মিশে তৈরি হয় সেই অনুষ্ঠান, যা দশকের পর দশক ধরে আকাশবাণীতে প্রচারিত হচ্ছে।
বেতারে কাজের পাশাপাশি নাটক লেখা, পরিচালনা ও অভিনয়ের অভিজ্ঞতাও ছিল তাঁর। কেবল শ্লোক উচ্চারণ করাই তাঁর কাজ ছিল না। শব্দ দিয়ে দৃশ্য তৈরি করতে জানতেন তিনি।
‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শুনলে বিষয়টি বোঝা যায়। কখনো তাঁর কণ্ঠে যুদ্ধের আবহ তৈরি হয়, কখনো স্তোত্রের উচ্চারণে আসে সংযম। সংস্কৃত না জানা শ্রোতাও কণ্ঠের পরিবর্তন থেকে গল্পের গতি কিছুটা বুঝতে পারেন।
কিন্তু বেতারে এই চণ্ডীপাঠের দায়িত্ব দেওয়া হলে রক্ষণশীল মহলের একাংশ আপত্তি তোলে।
কারণটি ছিল তাঁর জাতিগত পরিচয়।
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র ছিলেন কায়স্থ। ব্রাহ্মণ নন। তখনকার সমাজের একাংশের ধারণা ছিল, ব্রাহ্মণ নন এমন কারও মুখে চণ্ডীপাঠ গ্রহণযোগ্য নয়।
ভাবা যায়?
যাঁর উচ্চারণ পরে বাঙালির এত পরিচিত হয়ে উঠল, সেই মানুষটির যোগ্যতা বিচার করার আগেই তাঁর জন্মপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।
এই আপত্তির মুখে পিছিয়ে যাননি অনুষ্ঠানের রচয়িতা বাণী কুমার। তাঁর প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। তিনি বীরেন্দ্রকৃষ্ণকেই রাখতে চেয়েছিলেন। বেতারকেন্দ্রের কর্তা নৃপেন্দ্রনাথ মজুমদারও এই সংকীর্ণতার বিরোধিতা করেছিলেন বলে বিভিন্ন স্মৃতিচারণে পাওয়া যায়।
ঘটনাটি বুঝতে সে সময়ের সমাজকে মনে রাখা দরকার। জাতপাতের বাধা তখন প্রকাশ্য। ধর্মীয় পাঠ কে করতে পারবেন, কার কণ্ঠ গ্রহণযোগ্য হবে, এসব প্রশ্নেও সামাজিক শ্রেণিবিভাগের প্রভাব ছিল।
সেখানে বাণী কুমারের সিদ্ধান্তটি কেবল শিল্পী বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত ছিল না।
বেতারের অনুষ্ঠানে কণ্ঠই প্রধান। জন্মপরিচয় নয়।
এই অবস্থান শেষ পর্যন্ত টিকে যায়।
অনুষ্ঠানটির গোড়ার ইতিহাসও বেশ দীর্ঘ। ১৯৩১ সালে ‘বসন্তেশ্বরী’ নামে চণ্ডী-আশ্রিত একটি বেতার পরিবেশনা হয়েছিল। ১৯৩২ সালে শারদীয় অনুষ্ঠানের যে রূপ তৈরি হয়, সেখান থেকেই ধীরে ধীরে পরিচিত ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র বিকাশ। প্রথম দিকে ষষ্ঠীর সকালেও অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হয়েছে। পরে মহালয়ার ভোরের সঙ্গে তার স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
রচনা ও সংগীতেও সময়ে সময়ে পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘকাল অনুষ্ঠানটি সরাসরি পরিবেশিত হতো। ষাটের দশকে রেকর্ড করা সংস্করণ প্রচলিত হয়। ১৯৬৬ সালের রেকর্ডিং বিশেষ পরিচিত হলেও আকাশবাণীর সংগ্রহে অন্য বছরের পরিবেশনাও রয়েছে।
অথচ এসব পরিবর্তনের মধ্যেও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠটি শ্রোতাদের কাছে মূল আকর্ষণ হয়ে থেকেছে।
১৯৯১ সালের ৩ নভেম্বর তিনি মারা যান।
মানুষটি চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর কণ্ঠ আজও ঘুম ভাঙায় এমন সব শিশুর, যাদের জন্ম তাঁর মৃত্যুর অনেক পরে।
যে সমাজের একাংশ তাঁকে চণ্ডীপাঠের উপযুক্ত মনে করেনি, সেই সমাজের পরবর্তী প্রজন্মই তাঁকে মহালয়ার সবচেয়ে আপন কণ্ঠ হিসেবে গ্রহণ করেছে।
এই ইতিহাসের আরও একটি অংশ আছে।
বীরেন্দ্রকৃষ্ণের পাশে যাঁরা বাজাতেন, তাঁদের পরিচয়ও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়।
মহালয়ার সেই স্টুডিওতে ধর্মের আগে ছিল সুর
কলকাতার পুরোনো বেতারকেন্দ্রের কথা ভাবুন।
অনুষ্ঠান শুরুর আগে শিল্পীরা এসে জড়ো হয়েছেন। যন্ত্রের সুর মিলছে। গায়কেরা শেষবারের মতো গান ঝালিয়ে নিচ্ছেন। কোথাও শঙ্খ বাজানোর প্রস্তুতি, কোথাও বাদ্যযন্ত্রের তার ঠিক করা হচ্ছে।
আজকের মতো একটি বোতাম টিপে রেকর্ডিং চালিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা তখন ছিল না। সরাসরি অনুষ্ঠানে ভুল হলে তা ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগও ছিল সামান্য।
এই পরিবেশনায় দরকার ছিল বহু মানুষের সমন্বয়।
প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, সুপ্রীতি ঘোষ, শ্যামল মিত্র, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়সহ বিভিন্ন সময়ের নামী শিল্পীরা ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
গানের সঙ্গে ছিল বড় বাদ্যযন্ত্রের দল।
সেই দলে হারমোনিয়াম বাজাতেন খুশি মহম্মদ। সারেঙ্গিতে ছিলেন মুন্সি, চেলোয় তাঁর ভাই আলি। বেহালায় তারকনাথ দে, ম্যান্ডোলিনে সুরেন পাল, গিটারে সুজিত নাথ। পিয়ানোয় রাইচাঁদ বড়ালের মতো শিল্পীও যুক্ত ছিলেন।
নামগুলো পাশাপাশি পড়লেই ছবিটা পরিষ্কার হয়।

একটি হিন্দু ধর্মীয় কাহিনিনির্ভর অনুষ্ঠানে মুসলমান শিল্পীরা বাজাচ্ছেন। তাঁদের সঙ্গে কাজ করছেন হিন্দু শিল্পীরা। সকলের ভাষা, ধর্মীয় অভ্যাস কিংবা পারিবারিক সংস্কৃতি এক নয়।
কিন্তু অনুষ্ঠানের জন্য তাঁরা একই সংগীতের অংশ।
কিছু স্মৃতিচারণে পাওয়া যায়, ভিন্ন ভাষাভাষী বাদ্যশিল্পীদের কেউ কেউ বাংলা ভাষ্য বা সংস্কৃত স্তোত্রের সব শব্দ বুঝতেন না। তাঁরা কণ্ঠের ওঠানামা, সংগীতের সংকেত আর দীর্ঘ মহড়ার অভিজ্ঞতা অনুসরণ করতেন।
ভাষা না বুঝেও সুরের ভিতরে নিজের জায়গা খুঁজে নেওয়া সহজ কাজ নয়।
আবার এ কথাও মনে রাখা দরকার, তাঁরা কেবল সম্প্রীতির সুন্দর ছবি তৈরি করতে স্টুডিওতে উপস্থিত ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন দক্ষ পেশাদার শিল্পী। তাঁদের বাদ্যযন্ত্র ছাড়া অনুষ্ঠানটির পরিচিত সংগীতরূপ তৈরি হতো না।
মুসলমান শিল্পীরা নিজেদের কাজ করেছেন। হিন্দু শিল্পীরা নিজেদের কাজ করেছেন। কেউ কাউকে তাঁর বিশ্বাস ছেড়ে আসতে বলেননি।
এটাই সেই বেতার অনুষ্ঠানের ইতিহাসকে আলাদা করে।
আজ আমরা যে অনুষ্ঠানকে হিন্দু বাঙালির ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে মিলিয়ে দেখি, তার সংগীত নির্মাণে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের অবদান রয়েছে।
মহালয়া যে বৃহত্তর বাঙালি সংস্কৃতিরও সম্পদ হয়ে উঠেছে, তার একটি কারণ এই যৌথ শ্রম।
তবে শিল্পীদের তৈরি করা অনুষ্ঠান শেষ পর্যন্ত কার হাতে বেঁচে থাকে?
তার উত্তর এসেছিল ১৯৭৬ সালে।
১৯৭৬ সালে মহালয়ার ভোরে বাঙালি শ্রোতারা বলেছিলেন, ‘না’
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠ তখন বহু দশকের পরিচিত। ঘরে ঘরে সেই অনুষ্ঠান শোনার অভ্যাস তৈরি হয়েছে।
এরই মধ্যে অল ইন্ডিয়া রেডিও, অর্থাৎ আকাশবাণী, সিদ্ধান্ত নিল পরিচিত ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র বদলে নতুন একটি অনুষ্ঠান প্রচার করবে।
নাম ‘দেবীং দুর্গতিহারিণীম্’।
ভাষ্যপাঠের কেন্দ্রে থাকবেন বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমার। সংগীতের দায়িত্বে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।
দুজনেই তখন বাঙালির অত্যন্ত প্রিয় শিল্পী।
আয়োজকেরা হয়তো ভেবেছিলেন, এত বড় দুই নামের উপস্থিতিতে নতুন অনুষ্ঠানটি সহজেই গ্রহণযোগ্য হবে।
কিন্তু বেতারকর্তারা একটি ব্যাপার বুঝতে পারেননি।
শ্রোতারা উত্তম কুমারকে ভালোবাসতেন ঠিকই, কিন্তু মহালয়ার ভোরে তাঁর কণ্ঠ শোনার অভ্যাস তাঁদের ছিল না।
১৯৭৬ সালের সেই সকালে পরিচিত অনুষ্ঠানের বদলে নতুন পরিবেশনা শুনে বহু শ্রোতা ক্ষুব্ধ হন।
আকাশবাণীর দপ্তরে প্রতিবাদী ফোন আসতে থাকে। বেতার ভবনের বাইরেও বিক্ষোভ হয়। সংবাদমাধ্যমে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এখানে উত্তম কুমারের অভিনয়ক্ষমতা বা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সংগীতপ্রতিভা নিয়ে প্রশ্ন ছিল না। বাঙালি তাঁদের ভালোবাসা বন্ধ করে দেয়নি।
আপত্তি ছিল অন্য জায়গায়।
যে অনুষ্ঠানের সঙ্গে পরিবারের স্মৃতি, শৈশবের ভোর, বাড়ির বড়দের ডাক আর পূজার অপেক্ষা মিশে গেছে, সেটি হঠাৎ বদলে দেওয়া যায় কি?
একজন জনপ্রিয় চলচ্চিত্রতারকা বেতারের একটি পরিচিত কণ্ঠের বিকল্প হবেনই, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
আর বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের নিজের জন্য ঘটনাটি ছিল বেদনাদায়ক। তাঁর পরিবারের স্মৃতিচারণে জানা যায়, অনুষ্ঠান বদলের সিদ্ধান্ত তাঁকে আগে জানানোও হয়নি।
তিনি নতুন অনুষ্ঠানটি শুনেছিলেন। প্রকাশ্যে বড় কোনো বিবাদে জড়াননি।
কিন্তু শ্রোতারা চুপ থাকেননি।
১৯৭৭ সালে আকাশবাণী আবার বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের পরিচিত ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ ফিরিয়ে আনে।
একে নিছক পুরোনো দিনের প্রতি দুর্বলতা বললে পুরো ঘটনাটি বোঝা যায় না।
শ্রোতারা জানিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁদের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক অভ্যাসকে অগ্রাহ্য করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয়।
অথচ বেতার অনুষ্ঠানের এই জয়লাভের গল্পে কোনো রাজা নেই, সেনাপতি নেই। আছে ঘুমভাঙা সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ।
যে কণ্ঠকে একসময় জাতের কারণে বাতিল করতে চাওয়া হয়েছিল, বহু বছর পরে সেই কণ্ঠ ফিরিয়ে আনার দাবি তুলেছিলেন শ্রোতারাই।
এরপর আরও অনেক বছর কেটে গেছে। বেতারের পুরোনো যন্ত্র বদলেছে, দেশ বদলেছে, শ্রোতার বসবাসও ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে।
তবু ভোরের ডাকটি থেকে গেছে।
মহালয়া কলকাতা ছাড়িয়ে ঢাকায়, তারপর প্রবাসের ঘরে
কলকাতায় জন্ম নেওয়া বেতার অনুষ্ঠানটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও দীর্ঘদিনের।
এখানে দুর্গাপূজা মানে কেবল মণ্ডপে প্রতিমা দেখা নয়। অনেক পরিবারের কাছে পূজার প্রস্তুতি শুরু হয় ঘর পরিষ্কার করা, নতুন পোশাকের কথা ভাবা, আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করা আর মহালয়ার ভোরে সেই পরিচিত অনুষ্ঠান শোনার মধ্য দিয়ে।
ঢাকার কোনো বাড়িতে পুরোনো রেডিও চালানো হয়। কোথাও মুঠোফোনে বাজে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। নতুন প্রজন্মের কেউ হয়তো ইউটিউবে খুঁজে নেয় বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কণ্ঠ।
মাধ্যম বদলেছে। শুনতে বসার কারণ সব বাড়িতে বদলায়নি।
বাংলাদেশে মহালয়ার ধর্মীয় আচারও যথাযোগ্য গুরুত্ব নিয়ে পালিত হয়। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে ভোরের বিশেষ আয়োজনের খবর আগেও প্রকাশিত হয়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন মন্দিরে পূজা, প্রার্থনা ও তর্পণের ব্যবস্থা থাকে।
এই আচার হিন্দু সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্মীয় জীবনের অংশ। কিন্তু বেতারের গান ও ভাষ্য শোনার অভিজ্ঞতা সেই গণ্ডির বাইরে পরিচিত হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের সাংবাদিক পার্থপ্রতিম ভট্টাচার্য একবার মহালয়াকে বাঙালির নস্টালজিয়ার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছিলেন।
কথাটির মধ্যে অভিজ্ঞতার একটি সত্য আছে।
অনেকের কাছে মহালয়ার অর্থ শুধু পূজা আসছে, তা নয়। সেই শব্দ শুনলে নিজের শৈশবের ঘর, বাবা-মায়ের মুখ কিংবা হারিয়ে যাওয়া কোনো সকালও মনে পড়ে।
সেই স্মৃতিতে ধর্মীয় বিশ্বাস যেমন থাকতে পারে, তেমনি থাকতে পারে ভাষা, পরিবার ও একসঙ্গে বড় হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা।
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত এই স্মৃতিকে পুরোপুরি আলাদা করতে পারেনি।
বেতারের তরঙ্গের তো পাসপোর্ট লাগে না।
এই সাংস্কৃতিক সম্পর্কের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাও ঘটেছে।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে ইউনেসকো ‘কলকাতার দুর্গাপূজা’কে মানবতার অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।
এখানে একটি পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। স্বীকৃতিটি মহালয়া বা ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ বেতার অনুষ্ঠানকে আলাদাভাবে দেওয়া হয়নি। স্বীকৃতি পেয়েছে কলকাতার দুর্গাপূজার বিস্তৃত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যার সঙ্গে মহালয়ার সম্পর্ক রয়েছে।
ইউনেসকোর বর্ণনায় শিল্পী, কারিগর, সাধারণ দর্শনার্থী এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের মানুষের অংশগ্রহণও গুরুত্ব পেয়েছে।
যে উৎসবকে ঘিরে এত মানুষের কাজ, তার সাংস্কৃতিক বিস্তার যে ধর্মীয় আচার পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা অস্বাভাবিক নয়।
প্রবাসেও ছবিটা কাছাকাছি।
২০২৬ সালের ১০ অক্টোবর যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারে গ্রেটার ম্যানচেস্টার বেঙ্গলি হিন্দু কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন মহালয়া উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। সেখানে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র পাশাপাশি গান, আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার কথা জানানো হয়েছে।
অনুষ্ঠানটি ভোরে নয়, স্থানীয় সময় বিকেল চারটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত হওয়ার কথা।
সময় পাল্টেছে, স্থান পাল্টেছে। কিন্তু যে স্মৃতি মানুষকে এক জায়গায় ডেকে আনে, সেটি রয়ে গেছে।
আবার কেউ হয়তো প্রবাসে একাই থাকেন। সকালে কাজে যেতে হবে বলে ভোরে উঠতে পারেন না। রাতে বাড়ি ফিরে রেকর্ডিং চালান।
তাঁর কাছে মহালয়া তখন ঘড়ির নির্দিষ্ট সময় নয়। পরিচিত কণ্ঠের কাছে কিছুক্ষণের জন্য ফিরে যাওয়া।
তবু এই ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেও কিছু সংবেদনশীলতার প্রয়োজন আছে।
মহালয়া সবার সঙ্গে ভাগ করা যায়, কিন্তু সবকিছুকে নিজের বলা যায় না
মহালয়া সবার—কথাটি শুনতে ভালো। কিন্তু এর অর্থ কী, সেটি পরিষ্কার থাকা দরকার।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য মহালয়া একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় দিন। তর্পণ, পূর্বপুরুষের স্মরণ এবং দেবীপক্ষের আচার তাঁদের বিশ্বাস ও পারিবারিক রীতির অংশ।
অন্য ধর্মের কেউ সেই আচারে অংশ নেবেন কি না, সেটি ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আমন্ত্রণের বিষয়।
কিন্তু ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শুনতে কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না।
আপনার কোনো বন্ধু আগে কখনো অনুষ্ঠানটি শোনেননি? তাঁকে শুনতে বলতে পারেন। শুরুতেই সংস্কৃত স্তোত্রের অর্থ বোঝানোর দরকার নেই। বলুন, এই অনুষ্ঠানটি কীভাবে তৈরি হয়েছিল। কারা গান গেয়েছেন, কারা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়েছেন, কেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কণ্ঠ এত পরিচিত হয়ে উঠেছে।
অনেক সময় গল্পটি জানলেই শোনার আগ্রহ তৈরি হয়।
তবে নদীর ঘাটে তর্পণ দেখতে গেলে কিছুটা দূরত্ব রাখা ভালো। যিনি প্রয়াত বাবা বা মায়ের জন্য জল দিচ্ছেন, তাঁর কাছে এটি ছবি তোলার সুন্দর দৃশ্য নাও হতে পারে।
অনুমতি ছাড়া কারও মুখের কাছে ক্যামেরা ধরার কোনো কারণ নেই।
একই কথা প্রযোজ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ছবি প্রকাশ করার আগে যাঁরা ছবিতে আছেন, তাঁদের স্বাচ্ছন্দ্যের কথাও ভাবা দরকার।
আর ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শুনতে চাইলে মূল বেতার পরিবেশনার বিশ্বস্ত রেকর্ডিং বেছে নেওয়া ভালো। ইউটিউবে বহু নতুন পরিবেশনা আছে। সেগুলোর নিজস্ব মূল্য থাকতে পারে, কিন্তু সবগুলো বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের অনুষ্ঠান নয়।
আকাশবাণীর সংরক্ষিত বিভিন্ন সংস্করণের মধ্যেও পার্থক্য আছে। কাজেই ১৯৬৬ সালের একটি রেকর্ডিংই প্রতি বছর অপরিবর্তিতভাবে বাজানো হয়, এমন ধারণা ঠিক নয়।
শুভেচ্ছা জানানোর ক্ষেত্রেও একটু সংযম ভালো।
‘শুভ মহালয়া’ বলা নিয়ে অনেকের আপত্তি আছে। কারণ, এই দিন পিতৃপক্ষের সমাপ্তিতে প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা হয়। আবার বহু মানুষ প্রচলিত সামাজিক শুভেচ্ছা হিসেবেই কথাটি ব্যবহার করেন।
সব পরিবার একইভাবে বিষয়টি দেখবে, এমন নয়।
কেউ তর্পণে যাচ্ছেন জানলে তাঁর স্মরণের আচারকে সম্মান জানানোই যথেষ্ট। আর পরিচিত কাউকে পূজার আগমনী শুভেচ্ছা জানাতেও বাধা নেই।
আসলে একটি সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে হলে তার সব অংশের ওপর নিজের অধিকার দাবি করতে হয় না।
শোনার জন্য কান থাকলেই চলে। বোঝার জন্য একটু আগ্রহ।
১০ অক্টোবরের ভোরে হয়তো কোনো বাড়িতে আবার রেডিও চালু হবে। পাশে বসা একটি শিশু জিজ্ঞেস করবে, এত সকালে এই অনুষ্ঠান শোনা হয় কেন।
বাড়ির বড় কেউ হয়তো দেবী দুর্গার গল্প বলবেন। কেউ বলবেন নিজের ছোটবেলার কথা। আর কেউ জানাবেন, এই মহালয়ার সুর তৈরি করেছিলেন কত রকম মানুষ।
তারপর ঘরের সবাই চুপ করে শুনবেন।
বাইরে তখনও ভোর হয়নি। ঘরের ভেতর একটু আগে হয়ে গেছে।
মহালয়া নিয়ে যে প্রশ্নগুলো বারবার ফিরে আসে
মহালয়াকে কেন শুধু হিন্দুদের নয়, সবার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বলা হয়?
মহালয়া হিন্দুধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। তবে এই দিনের সঙ্গে যুক্ত ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ অনুষ্ঠানটির নির্মাণে নানা ধর্ম ও জাতিগত পরিচয়ের শিল্পীরা অংশ নিয়েছিলেন। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে ঘিরে জাতপাতের আপত্তি এবং ১৯৭৬ সালে শ্রোতাদের প্রতিবাদের ইতিহাসও অনুষ্ঠানটিকে বৃহত্তর বাঙালি সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ করে তুলেছে।
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র কি ব্রাহ্মণ ছিলেন?
না। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র ছিলেন কায়স্থ সম্প্রদায়ের মানুষ। রক্ষণশীল সমাজের একাংশ তাঁর চণ্ডীপাঠ নিয়ে আপত্তি তুলেছিল। কিন্তু বাণী কুমার ও বেতারকেন্দ্রের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁকে অনুষ্ঠানে রাখার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।
অন্য ধর্মের মানুষ কি মহিষাসুরমর্দিনী শুনতে পারেন?
অবশ্যই। এটি হিন্দু ধর্মীয় কাহিনিনির্ভর একটি বেতার অনুষ্ঠান, তবে শোনার ক্ষেত্রে কোনো ধর্মীয় বিধিনিষেধ নেই। সংস্কৃত স্তোত্র, বাংলা গান, ভাষ্য ও সংগীতের জন্যও অনুষ্ঠানটি শোনা যায়।
মহালয়া ২০২৬ কবে? দুর্গাপূজা কবে শুরু?
২০২৬ সালের মহালয়া শনিবার, ১০ অক্টোবর। দুর্গাপূজার মূল অনুষ্ঠান শুরু হবে এর প্রায় এক সপ্তাহ পরে। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে পঞ্জিকাভেদে কিছু আচারের তিথি ও সময়ে পার্থক্য থাকতে পারে।
মহিষাসুরমর্দিনী কখন শোনা যায়?
আকাশবাণী কলকাতায় মহালয়ার ভোরে ঐতিহ্যগতভাবে ভারতীয় সময় সকাল চারটায় অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করা হয়। বাংলাদেশ সময়ে তা ভোর সাড়ে চারটা। সম্প্রচারের নির্দিষ্ট সময়সূচি আগেই মিলিয়ে নেওয়া ভালো। রেকর্ডিং অনলাইনেও শোনা যায়।
১৯৭৬ সালে উত্তম কুমারের অনুষ্ঠান কেন জনপ্রিয় হয়নি?
উত্তম কুমার ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো জনপ্রিয় শিল্পী থাকা সত্ত্বেও শ্রোতারা পরিচিত ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র পরিবর্তন মেনে নেননি। দীর্ঘদিনের অভ্যাস ও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠের প্রতি টান থেকেই প্রতিবাদ তৈরি হয়। ১৯৭৭ সালে পুরোনো অনুষ্ঠান ফিরে আসে।


