এআই দিয়ে মুখ বদলানোর অ্যাপ ব্যবহার করলে ছবির অধিকার কার হাতে থাকে?

সর্বাধিক আলোচিত

এআই ফেস সোয়াপ অ্যাপে নিজের ছবি দিয়ে অন্য কারও চেহারা তৈরি করতে কয়েক সেকেন্ডই যথেষ্ট। কিন্তু ছবিটি আপলোড করার পর সেটির কী হয়, তা নিয়ে অনেকেরই পরিষ্কার ধারণা নেই। ছবির কপিরাইট কি আগের মতো নিজের থাকে? অ্যাপ কোম্পানি কি সেটি অন্য কাজে ব্যবহার করতে পারে? পরে ছবিটি মুছে ফেলতে চাইলে সেই সুযোগই বা কতটা আছে?

ফেস সোয়াপ অ্যাপে ছবি আপলোড করলেই সাধারণত তার কপিরাইট কোম্পানির হাতে চলে যায় না। তবে অ্যাপের শর্তে সম্মতি দেওয়ার সময় আপনি ছবিটি ব্যবহারের কিছু অধিকার কোম্পানিকে দিয়ে থাকতে পারেন। ঠিক কতটা অধিকার দিচ্ছেন, সেটাই আসল প্রশ্ন।

একটি ছবির মালিক হওয়া আর ছবিটি কোথায়, কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, তার ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা এক কথা নয়। ফেস সোয়াপ অ্যাপের গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগের বড় অংশ এই পার্থক্য থেকেই তৈরি হয়।

ছবির মালিকানা আর ব্যবহারের অনুমতি এক নয়

ধরুন, নিজের ফোনে একটি ছবি তুলেছেন। সেটি ফেস সোয়াপ অ্যাপে দিয়ে মুখ বদলে নিলেন। সম্পাদনার পর নতুন ছবিটি ফোনে সংরক্ষণ করলেন।

এখানে মূল ছবির কপিরাইট সাধারণ পরিস্থিতিতে আপনারই থাকতে পারে। অ্যাপের কাজ ছিল ছবিটি সম্পাদনা করা। কিন্তু সেই কাজের জন্য কোম্পানিকে ছবিটি গ্রহণ, প্রক্রিয়াকরণ এবং প্রয়োজনে সাময়িকভাবে সংরক্ষণের অনুমতি দিতে হয়েছে।

আইনের ভাষায় এই অনুমতিকে লাইসেন্স বলা হয়। কপিরাইটের মালিকানা ও লাইসেন্সের মধ্যে পার্থক্য আছে। মালিকানা কারও কাছে থাকলেও তিনি অন্য প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট কাজে তাঁর ছবি ব্যবহারের অনুমতি দিতে পারেন। এতে মূল মালিকানা অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

বিষয়টি বোঝার জন্য একটি সাধারণ উদাহরণ যথেষ্ট। একজন ফটোগ্রাফার কোনো প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে নিজের তোলা ছবি ব্যবহারের অনুমতি দিতে পারেন। কিন্তু সেই অনুমতি পাওয়ার অর্থ এই নয় যে প্রতিষ্ঠানটি ছবিটির সম্পূর্ণ কপিরাইটের মালিক হয়ে গেল।

ফেস সোয়াপ অ্যাপের ক্ষেত্রেও অনেকটা একই বিষয় ঘটে। অবশ্য আপনার ফোনে থাকা প্রতিটি ছবির কপিরাইট যে আপনারই, তা নয়। অন্যের তোলা ছবি কিংবা প্রতিষ্ঠানের হয়ে তৈরি কাজের মালিকানা চুক্তি ও প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।

আরও পড়ুন: গুগল অ্যাকাউন্টের প্রাইভেসি চেকআপ: কোন সেটিংস আগে বদলাবেন

শর্তাবলিতে কয়েকটি শব্দ বিশেষভাবে খেয়াল করুন

শর্তাবলিতে কয়েকটি শব্দ বিশেষভাবে খেয়াল করুন

অ্যাপের Terms of Service-এ সাধারণত লাইসেন্সের পরিধি লেখা থাকে। সেখানে Non-exclusive থাকলে কোম্পানিকে অনুমতি দেওয়ার পরও আপনি সাধারণত অন্য কাউকে একই ছবি ব্যবহারের অনুমতি দিতে পারবেন। Royalty-free বলতে অনুমোদিত ব্যবহারের জন্য আলাদা রয়্যালটি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা সাধারণত না থাকাকে বোঝায়। Worldwide থাকলে সেই অনুমতি বিশ্বব্যাপী প্রযোজ্য হতে পারে।

Sublicensable শব্দটি আরেকটু মনোযোগ দিয়ে পড়া দরকার। এর মাধ্যমে কোম্পানি অনুমোদিত কিছু অধিকার অন্য সেবাদাতাকে দেওয়ার সুযোগ পেতে পারে। আবার Perpetual লাইসেন্সের ক্ষেত্রে অনুমতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে।

তবে একটি শব্দ দেখে পুরো চুক্তির অর্থ নির্ধারণ করা যায় না। কোম্পানি ছবিটি কোন কাজে ব্যবহার করতে পারবে, অনুমতি কত দিন থাকবে এবং সেটি প্রত্যাহার করা যাবে কি না—এসবও দেখতে হবে।

FaceApp-এর শর্তে আসলে কী আছে?

বিষয়টি বুঝতে FaceApp-এর উদাহরণ নেওয়া যায়। অ্যাপটির প্রকাশিত ব্যবহারের শর্তে বলা হয়েছে, ব্যবহারকারীর জমা দেওয়া মূল ছবি কিংবা অ্যাপের মাধ্যমে পরিবর্তন করে সংরক্ষণ বা শেয়ার করা ছবির মালিকানা প্রতিষ্ঠানটি দাবি করে না।

কিন্তু কোম্পানিকে একটি নির্দিষ্ট লাইসেন্স দেওয়া হয়। সেই লাইসেন্সের আওতায় সেবা দেওয়ার জন্য ছবিটি ব্যবহার, পরিবর্তন এবং সাময়িকভাবে সংরক্ষণ করার সুযোগ রয়েছে। লাইসেন্সটি বিশ্বব্যাপী প্রযোজ্য হলেও প্রকাশিত শর্তে এর উদ্দেশ্য ও মেয়াদ নির্ধারণ করা আছে।

এই পর্যন্ত পড়ে ব্যবহারকারী হয়তো নিশ্চিন্ত হতে পারেন। কিন্তু একই শর্তাবলিতে আরেকটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা বিশেষ করে গ্রাফিক ডিজাইনার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জানা দরকার। FaceApp তার সেবাকে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নির্ধারণ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির শর্তে বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং অন্যের হয়ে ছবি সম্পাদনার সেবা দেওয়া নিষিদ্ধ।

অর্থাৎ নিজের জন্য একটি ছবি সম্পাদনা করা আর ক্লায়েন্টের বিজ্ঞাপনে ব্যবহারের জন্য ছবি তৈরি করা এক বিষয় নয়। অ্যাপটির পেইড সাবস্ক্রিপশন থাকলেও এই ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে উঠে যায় না। পেশাদার কাজে কোনো সফটওয়্যার ব্যবহারের আগে তাই লাইসেন্সের অংশটি আলাদা করে পড়তে হবে।

আরেকটি কথা মনে রাখা ভালো। FaceApp-এর নীতি অন্য সব ফেস সোয়াপ অ্যাপের নীতির প্রতিনিধিত্ব করে না। একটি প্রতিষ্ঠানের শর্ত দেখে পুরো প্রযুক্তি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।

এআই দিয়ে বদলে দেওয়া ছবির কপিরাইট কার?

এখানে প্রশ্নটি কিছুটা জটিল হয়ে যায়। ধরুন, নিজের মুখ একটি চলচ্চিত্রের দৃশ্যে বসিয়েছেন। নতুন ছবিতে আপনার চেহারা রয়েছে, কিন্তু পেছনের দৃশ্যটি অন্য কারও তৈরি। সেটি চলচ্চিত্রের কোনো অংশ, পেশাদার ফটোগ্রাফারের ছবি কিংবা অ্যাপের প্রস্তুত টেমপ্লেটও হতে পারে।

মুখ বদলে দেওয়ার কারণে ওই মূল কাজগুলোর কপিরাইট হারিয়ে যায় না। আবার নতুন ছবিটি তৈরি করার জন্য কতটা সৃজনশীল কাজ করেছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কপিরাইট অফিসের ২০২৫ সালের মূল্যায়নে মানুষের সৃজনশীল অবদানের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এআইয়ের সহায়তায় তৈরি কোনো কাজে মানুষের যথেষ্ট সৃজনশীল অবদান থাকলে সেই অংশ কপিরাইট সুরক্ষা পেতে পারে।

কিন্তু শুধু একটি নির্দেশনা লিখে ছবি তৈরি করলেই পুরো ফলাফলের কপিরাইট পাওয়া যাবে, এমন সিদ্ধান্ত ওই মূল্যায়ন সমর্থন করে না। একজন ডিজাইনার হয়তো নিজের তোলা কয়েকটি ছবি, আলো, রং, বিন্যাস এবং সম্পাদনার সিদ্ধান্ত মিলিয়ে একটি কাজ তৈরি করেছেন। অন্য একজন কেবল প্রস্তুত ফিল্টার বেছে নিয়েছেন। দুজনের সৃজনশীল অবদানকে একইভাবে মূল্যায়ন করা যাবে না।

এখানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাখ্যাকে অবশ্য বাংলাদেশ বা ভারতের আইন হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। ভারতের কপিরাইট আইন, ১৯৫৭-এ কম্পিউটারের মাধ্যমে তৈরি কাজের প্রণেতা নিয়ে বিধান রয়েছে। তবে আধুনিক জেনারেটিভ এআইয়ের ক্ষেত্রে সেই বিধানের প্রয়োগ সব পরিস্থিতিতে সরল নয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট কাজটি কীভাবে তৈরি হয়েছে, মূল উপাদানগুলোর অধিকার কার এবং প্রযোজ্য আইনে কী বলা আছে, তা দেখতে হবে।

অন্যের মুখ বসিয়ে ছবি তৈরি করলে?

নিজের ছবির অধিকার নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অন্য একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। ছবিতে থাকা ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহারের অধিকার এবং ছবিটির কপিরাইট আলাদা হতে পারে। কোনো বন্ধুর ছবি নিয়ে তাঁর অনুমতি ছাড়া মজার ফেস সোয়াপ তৈরি করলেন। সেটি নিজেদের মধ্যে রাখার বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।

আরও স্পষ্ট উদাহরণ হলো কোনো তারকার মুখ ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন তৈরি করা। বিজ্ঞাপনটি এমন ধারণা দিতে পারে যে তিনি পণ্যটির প্রচার করছেন, যদিও বাস্তবে তাঁর সঙ্গে পণ্যটির কোনো সম্পর্ক নেই। এ ধরনের ছবি সম্মতি, গোপনীয়তা এবং পরিচয়ের অপব্যবহার নিয়ে আইনি প্রশ্ন তুলতে পারে।

কাউকে অপমানজনক বা যৌনভাবে আপত্তিকর পরিস্থিতিতে দেখানো আরও গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে। প্রযুক্তির সাহায্যে কোনো ছবি তৈরি করা সম্ভব হওয়া আর সেটি প্রকাশ করার বৈধ অধিকার থাকা এক নয়। ফেস সোয়াপের ক্ষেত্রে এই সীমারেখাটি বোঝা জরুরি। বিশেষ করে অন্যের মুখ ব্যবহার করে প্রকাশ্য বা বাণিজ্যিক কনটেন্ট তৈরি করার সময়।

আপনার ছবি কি অ্যাপের সার্ভারে থেকে যায়?

আপনার ছবি কি অ্যাপের সার্ভারে থেকে যায়?

এবার কপিরাইট থেকে একটু সরে ব্যক্তিগত তথ্যের দিকে আসা যাক। একটি ছবি সম্পাদনা করার সময় অ্যাপটি কী করছে, তা সাধারণ ব্যবহারকারীর পক্ষে সরাসরি দেখা সম্ভব হয় না। কিছু অ্যাপের নির্দিষ্ট কাজ ফোনেই সম্পন্ন হতে পারে। অন্য অ্যাপ ছবি সার্ভারে পাঠিয়ে সেখানে সম্পাদনা করে ফলাফল ফিরিয়ে দেয়।

সার্ভারে পাঠানো হলে ছবিটির একটি সাময়িক অনুলিপি তৈরি হতে পারে। ফলে মূল প্রশ্ন দাঁড়ায়, সেই অনুলিপি কত দিন রাখা হচ্ছে এবং পরে কীভাবে মুছে ফেলা হচ্ছে। FaceApp-এর প্রকাশিত গোপনীয়তা নীতিতে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি ছবি সম্পাদনার জন্য Google Cloud Platform ও Amazon Web Services ব্যবহার করে।

কোম্পানিটির বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যবহারকারীর নির্বাচিত ছবি সাময়িকভাবে ক্লাউডে রাখা হয়। ছবিগুলো এনক্রিপ্ট করা থাকে এবং সংশ্লিষ্ট এনক্রিপশন কী ব্যবহারকারীর ডিভাইসে সংরক্ষিত হয়। শেষ সম্পাদনার পর ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সাময়িক অনুলিপি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে ফেলার ব্যবস্থা রয়েছে বলেও প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।

আর যে ছবি ব্যবহারকারী সম্পাদনার জন্য বেছে নেননি, সেগুলো সার্ভারে আপলোড করা হয় না বলে FaceApp-এর নীতিতে উল্লেখ রয়েছে। এখানে কোম্পানির বক্তব্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য রাখা দরকার। প্রকাশিত নীতিতে কী লেখা আছে, তা জানা যায়। কিন্তু প্রতিটি ছবির ক্ষেত্রে সার্ভারে ঠিক কী ঘটছে, তা স্বাধীন প্রযুক্তিগত পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত করা কঠিন।

অন্য অ্যাপের জন্য FaceApp-এর এই সময়সীমা প্রযোজ্য নয়। কোনো অ্যাপ কত দিন ছবি রাখবে, তার উত্তর সেই অ্যাপের নিজস্ব নীতিতেই খুঁজতে হবে।

ছবিগুলো কি এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহার হতে পারে?

কোনো অ্যাপ ছবি সম্পাদনার অনুমতি পেলেই সেই ছবি এআই মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহার করার অনুমতি পেয়ে যায় না। দুটো আলাদা উদ্দেশ্য। FaceApp-এর প্রকাশিত গোপনীয়তা নীতিতে ব্যবহারকারীর ছবি ও ভিডিও সম্পাদনার সুবিধা দেওয়া ছাড়া অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার না করার কথা বলা হয়েছে।

তবে এ ধরনের ঘোষণা সব ফেস সোয়াপ অ্যাপের ক্ষেত্রে নেই। কোনো অ্যাপের নীতিতে মডেল প্রশিক্ষণ, গবেষণা কিংবা সেবার উন্নয়নের জন্য ব্যবহারকারীর কনটেন্ট ব্যবহারের কথা থাকতে পারে। এখানে মূল ছবির পাশাপাশি ছবিটি থেকে তৈরি প্রযুক্তিগত তথ্যের বিষয়ও আসে। ব্যবহারকারীর আপলোড করা ছবি, তা থেকে তৈরি তথ্য এবং অ্যাপ ব্যবহারের পরিসংখ্যানের জন্য আলাদা নীতি থাকতে পারে।

এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা না পেলে বিশেষ করে ব্যক্তিগত বা সংবেদনশীল ছবি আপলোডের ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়াই যুক্তিসংগত।

মুখের ছবি নিয়ে আইনে কী বলা আছে?

ফেস সোয়াপের গোপনীয়তা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে মুখের ছবি বায়োমেট্রিক তথ্য কি না, সেই প্রশ্নও আসে। এখানে সব দেশের আইন এক নয়। যুক্তরাজ্যের তথ্য সুরক্ষা নিয়ন্ত্রকের ব্যাখ্যায় সাধারণ ডিজিটাল ছবি আর বিশেষ প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাউকে স্বতন্ত্রভাবে শনাক্ত করার উপযোগী তথ্যের মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছে।

বাংলাদেশের ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর বায়োমেট্রিক উপাত্তের সংজ্ঞায় মুখের ছবির উল্লেখ রয়েছে। আইনটিতে বায়োমেট্রিক উপাত্তকে সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে কোনো অ্যাপ মুখের ছবি সংগ্রহ করছে, ছবিটি থেকে শনাক্তকরণযোগ্য তথ্য তৈরি করছে কি না এবং সেই তথ্য কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে—এসব বিষয় প্রাসঙ্গিক।

বাংলাদেশে কপিরাইট আইন, ২০২৩-ও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আইনটির ১৫ ধারায় সাধারণ নিয়ম হিসেবে প্রণেতাকে কপিরাইটের প্রথম স্বত্বাধিকারী বলা হয়েছে। তবে চাকরির অধীনে তৈরি কাজ কিংবা অন্য ব্যক্তির উদ্যোগে ও অর্থের বিনিময়ে তোলা ছবির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রয়েছে। ১৬ ও ১৭ ধারায় কপিরাইটের স্বত্ব নিয়োগের বিধানও রয়েছে।

এর অর্থ, ছবি আপলোড করা, সেটি ব্যবহারের লাইসেন্স দেওয়া এবং সম্পূর্ণ কপিরাইট হস্তান্তর করার আইনি ফল একই নয়। অন্যদিকে ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এ তথ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ, সম্মতি এবং তথ্যধারীর অধিকার নিয়ে বিধান রয়েছে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সম্মতি প্রত্যাহার ও তথ্য মুছে ফেলার অনুরোধ করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

তবে আইনটির কয়েকটি ধারার কার্যকারিতা পরবর্তী সরকারি প্রজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরশীল। বিদেশি অ্যাপ কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রেও আইনটির প্রয়োগ এবং বাস্তবে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ আলাদাভাবে বিচার করতে হবে।

ভারতের ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে

ভারতে Digital Personal Data Protection Act, ২০২৩ এবং তার অধীনে প্রকাশিত ২০২৫ সালের বিধিমালা প্রাসঙ্গিক। তবে আইনটির সব বিধান একই সময়ে কার্যকর হয়নি। কিছু প্রশাসনিক বিধান আগে কার্যকর হয়েছে। ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, সম্মতি এবং তথ্যধারীর অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান পরবর্তী ধাপে কার্যকর হওয়ার জন্য নির্ধারিত।

ফলে ভারতে কোনো অ্যাপের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত তথ্যসংক্রান্ত অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধান কার্যকর হয়েছে কি না, তা দেখতে হবে।

বাংলাদেশ ও ভারতের এই আইনগুলো ব্যবহারকারীর অধিকার বোঝার জন্য প্রাসঙ্গিক হলেও কোনো বিদেশি অ্যাপের বিরুদ্ধে প্রতিকার পাওয়া সব ক্ষেত্রে সহজ হবে, এমন নিশ্চয়তা দেয় না।

অ্যাপ ইনস্টল করার আগে কতটা সতর্ক হওয়া দরকার?

সাধারণ একটি ছবি সম্পাদনার জন্য দীর্ঘ আইনি নথি পড়ার আগ্রহ অনেকেরই থাকবে না। কিন্তু কয়েকটি বিষয় না জেনে ব্যক্তিগত ছবি আপলোড করাও ঠিক নয়। প্রথমে অ্যাপটির প্রকাশক কে, সেটি দেখুন। অ্যাপ স্টোরে থাকা নামের সঙ্গে অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের তথ্য মিলিয়ে নেওয়া যায়।

এরপর Terms of Service এবং Privacy Policy খুলুন। প্রথমটিতে ছবির ব্যবহার ও লাইসেন্সের শর্ত থাকে। দ্বিতীয়টিতে তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং মুছে ফেলার নীতি পাওয়ার কথা। সব অংশ সমান গুরুত্ব দিয়ে পড়ার দরকার নেই। ছবির মালিকানা, ক্লাউডে সংরক্ষণের সময়সীমা, অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তথ্য ভাগ করার অনুমতি এবং এআই প্রশিক্ষণে ছবি ব্যবহারের বিষয়টি আগে দেখুন।

পেশাদার কাজের জন্য অ্যাপ বেছে নিলে বাণিজ্যিক ব্যবহারের লাইসেন্সও যাচাই করা দরকার। কোনো অ্যাপের সাবস্ক্রিপশন কিনলেই সেটি ক্লায়েন্টের কাজে ব্যবহারের অধিকার পাওয়া যায় না। আরেকটি সাধারণ বিষয় হলো ফোনের ছবির অনুমতি।

অ্যাপ যদি নির্বাচিত কয়েকটি ছবি দিয়েই কাজ করতে পারে, তাহলে পুরো গ্যালারির অনুমতি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। Android-এর Photo Picker কিংবা iPhone-এর নির্বাচিত ছবি ব্যবহারের সুবিধা থাকলে সেটি কাজে লাগানো যায়। ফোন ও অ্যাপের সংস্করণভেদে ব্যবস্থাটি আলাদা হতে পারে।

ছবির মধ্যেও কী তথ্য রয়েছে, তা খেয়াল করুন। পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, চিকিৎসার নথি কিংবা ব্যক্তিগত ঠিকানা দৃশ্যমান থাকলে এমন ছবি আপলোড না করাই ভালো।

ছবির অবস্থানসংক্রান্ত মেটাডেটা বাদ দেওয়া সম্ভব হলেও তাতে ছবির ভেতরের দৃশ্যমান তথ্য গোপন হয় না। শিশুদের ছবির ক্ষেত্রে সতর্কতা আরও জরুরি। অ্যাপটি কোন বয়সের ব্যবহারকারীদের জন্য তৈরি এবং শিশুদের ছবি ব্যবহারের বিষয়ে কী শর্ত দিয়েছে, তা দেখা উচিত।

FaceApp-এর প্রকাশিত শর্তে ১৩ বছরের কম বয়সীদের জন্য সেবাটি নির্ধারিত নয়। ওই বয়সের নিচে থাকা শিশুর ছবি আপলোডের ক্ষেত্রেও অভিভাবক হওয়ার শর্ত রয়েছে। অভিভাবকের অনুমতি থাকলেই অবশ্য সব ছবি তৃতীয় পক্ষের অ্যাপে দেওয়া উপযুক্ত হয়ে যায় না।

ছবি আপলোড করার পর মুছে ফেলতে চাইলে

অনেকেই মনে করেন, অ্যাপ আনইনস্টল করলে সেখানে দেওয়া ছবিগুলোও মুছে যাবে। বাস্তবে বিষয়টি অ্যাপের তথ্য সংরক্ষণের পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে। ফোন থেকে অ্যাপ সরানো, অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা এবং কোম্পানির সার্ভার থেকে তথ্য মুছে ফেলা আলাদা কাজ হতে পারে।

FaceApp-এর প্রকাশিত সহায়তা নির্দেশনায় ক্লাউডে সাময়িকভাবে সংরক্ষিত ছবি মুছে ফেলার ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে Settings → Privacy & Legal → Delete Cloud Photo Cache বিকল্পের কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছবি মুছে যাওয়ার নির্ধারিত সময়ের আগেই ক্লাউডে থাকা অনুলিপি সরানোর অনুরোধ করা যায়।

তবে অ্যাপের সংস্করণ এবং প্রকাশিত নির্দেশনাভেদে সেটিংসের নাম বা অবস্থান বদলাতে পারে। অন্য অ্যাপের ক্ষেত্রে প্রথমে সেটিংস ও গোপনীয়তা নীতি দেখুন। সেখানে তথ্য মুছে ফেলার ব্যবস্থা না পেলে কোম্পানির সহায়তা বিভাগে লিখিতভাবে অনুরোধ করা যেতে পারে। কখন ছবি আপলোড করেছেন এবং কোন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেছেন, তা উল্লেখ করলেই সাধারণত অনুরোধটি বোঝানো সহজ হবে। প্রয়োজন ছাড়া একই সংবেদনশীল ছবি আবার পাঠাবেন না।

পরিস্থিতি অবশ্য আরও গুরুতর হতে পারে। আপনার ছবি অনুমতি ছাড়া কোথাও প্রকাশ করা হলে সংশ্লিষ্ট পোস্টের ঠিকানা, স্ক্রিনশট এবং যোগাযোগের তথ্য সংরক্ষণ করুন। এরপর প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ জানান। পরিচয় জালিয়াতি, ব্ল্যাকমেইল বা গুরুতর গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে প্রমাণসহ আইনগত সহায়তা নেওয়া উচিত।

নিজের ছবির ওপর কতটা নিয়ন্ত্রণ রাখতে চান?

ফেস সোয়াপ অ্যাপ নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো, ছবির কপিরাইট নিজের থাকলেই সব অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে থাকবে। বাস্তবে ছবির কপিরাইট একটি বিষয়। ছবির অনুলিপি কোথায় রাখা হচ্ছে, কে সেটি প্রক্রিয়াকরণ করছে এবং পরে মুছে ফেলা যাচ্ছে কি না, সেগুলো আলাদা প্রশ্ন।

একটি সাধারণ ছবি সম্পাদনার জন্য অ্যাপ ব্যবহার করা আর ব্যক্তিগত, গোপনীয় বা অন্যের পরিচয়সংক্রান্ত ছবি আপলোড করার সিদ্ধান্ত এক হওয়া উচিত নয়। যে অ্যাপ ছবির ব্যবহার ও সংরক্ষণ সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য দেয়, তার শর্ত বিচার করা সহজ। কিন্তু যেখানে এসব বিষয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে, সেখানে সংবেদনশীল ছবি না দেওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।

ছবি আপলোড করার আগে তাই অ্যাপটি কী তৈরি করতে পারবে, তার পাশাপাশি ছবিটি নিয়ে কী করতে পারবে, সেটাও দেখুন। পর্দায় তৈরি হওয়া নতুন ছবিটির চেয়ে আপনার দেওয়া মূল ছবিটির ভবিষ্যৎ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১. বিনামূল্যের ফেস সোয়াপ অ্যাপ ব্যবহার করলে কি ছবির অধিকার কোম্পানির হয়ে যায়?

না। কোনো অ্যাপ বিনামূল্যে ব্যবহার করার অর্থ এই নয় যে আপলোড করা ছবির কপিরাইট স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোম্পানির হাতে চলে যাবে। ছবিটি ব্যবহারের জন্য কোম্পানি কী ধরনের লাইসেন্স পাচ্ছে, তা নির্ভর করে অ্যাপের শর্তাবলির ওপর। বিনামূল্যের ও পেইড অ্যাপের ক্ষেত্রেই এই শর্ত যাচাই করা দরকার।

২. ফেস সোয়াপ করা ছবিতে ওয়াটারমার্ক না থাকলে কি সেটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যাবে?

ওয়াটারমার্ক না থাকা বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতির প্রমাণ নয়। ছবিটি বিজ্ঞাপন, ব্যবসায়িক প্রচার কিংবা গ্রাহকের প্রকল্পে ব্যবহার করা যাবে কি না, তা অ্যাপের লাইসেন্স এবং ছবিতে ব্যবহৃত মূল উপাদানের অধিকারের ওপর নির্ভর করে। বিশেষ করে অন্যের মুখ বা কপিরাইটযুক্ত ছবি ব্যবহার করলে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

৩. অফলাইনে কাজ করা ফেস সোয়াপ অ্যাপ কি ব্যক্তিগত ছবির জন্য বেশি নিরাপদ?

কোনো অ্যাপ সত্যিই ডিভাইসের ভেতরে সম্পূর্ণ ছবি প্রক্রিয়াকরণ করলে ক্লাউড সার্ভারে মূল ছবি পাঠানোর ঝুঁকি কমতে পারে। কিন্তু অফলাইনে সম্পাদনার সুবিধা থাকলেই অ্যাপটি ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে না, এমন নিশ্চয়তা নেই। অ্যাপের অনুমতি, তথ্য সংগ্রহের নীতি এবং ইন্টারনেট সংযোগের সময় কী তথ্য পাঠানো হয়, তা যাচাই করা উচিত।

৪. অ্যাকাউন্ট তৈরি না করে ফেস সোয়াপ অ্যাপ ব্যবহার করলে কি পরিচয় গোপন থাকে?

অ্যাকাউন্ট ছাড়া অ্যাপ ব্যবহার করতে পারা মানেই সম্পূর্ণ বেনামে ব্যবহার করা নয়। অ্যাপটি ব্যবহারকারীর আপলোড করা ছবি, ডিভাইসসংক্রান্ত তথ্য বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করতে পারে। ঠিক কোন তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, তা সংশ্লিষ্ট অ্যাপের গোপনীয়তা নীতিতে দেখতে হবে।

৫. ফেস সোয়াপ অ্যাপকে দেওয়া অনুমতি প্রত্যাহার করলে কি আগের সব ছবি মুছে যাবে?

সব ক্ষেত্রে নয়। অনুমতি প্রত্যাহার, অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা এবং আগে সংরক্ষিত ছবি মুছে ফেলা আলাদা প্রক্রিয়া হতে পারে। কিছু তথ্য আইনগত কারণে নির্দিষ্ট সময় ধরে রাখার সুযোগও থাকতে পারে। তাই অনুমতি প্রত্যাহারের পাশাপাশি তথ্য মুছে ফেলার আলাদা অনুরোধ প্রয়োজন কি না, সেটি যাচাই করুন।

সর্বশেষ