বিনামূল্যের সফটওয়্যার দিয়ে ব্যবসার কাজ চালানো যাচ্ছে, তাহলে টাকা খরচ করে অন্য সফটওয়্যার কেনার দরকার কী? ছোট ব্যবসার জন্য প্রশ্নটি যথেষ্ট যুক্তিসংগত। শুরুতে খরচ কমাতে অনেক প্রতিষ্ঠান গুগল শিটস, বিনামূল্যের গ্রাহক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার কিংবা যোগাযোগের অ্যাপ ব্যবহার করে। তাতে কাজও চলে। কিন্তু ব্যবসা একটু বড় হলে সেই একই ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ধরা যাক, একটি অনলাইন দোকানে অর্ডার নেওয়া হচ্ছে এক জায়গায়, মজুত পণ্যের হিসাব রাখা হচ্ছে আরেক জায়গায়। গ্রাহকের তথ্য আছে তৃতীয় একটি সফটওয়্যারে। কর্মীরা প্রতিদিন এসব তথ্য মিলিয়ে কাজ করছেন। সফটওয়্যারের জন্য কোনো টাকা দিতে হচ্ছে না, কিন্তু একই তথ্য বারবার লেখা, ভুল সংশোধন আর হিসাব মেলানোর পেছনে সময় চলে যাচ্ছে।
এটাই বিনামূল্যের ব্যবসায়িক সফটওয়্যারের অদৃশ্য খরচের একটি সাধারণ উদাহরণ। সফটওয়্যারের নিয়মিত ব্যবহারের ফি নেই, অথচ সেটি ব্যবহার করতে গিয়ে অন্যভাবে খরচ হচ্ছে। সব প্রতিষ্ঠানে অবশ্য এমন সমস্যা হবে না। ছোট ব্যবসার অনেক কাজ বিনামূল্যের সফটওয়্যার দিয়েই ভালোভাবে করা যায়। বিষয়টি নির্ভর করে ব্যবসার কাজের ধরন, কর্মীদের সংখ্যা এবং সফটওয়্যার থেকে কী সুবিধা প্রয়োজন, তার ওপর।
বিনামূল্যের সফটওয়্যার কখন সমস্যায় ফেলতে শুরু করে?
একটি সফটওয়্যারের বিনামূল্যের ব্যবহারের সুযোগ প্রথমে যথেষ্ট মনে হতে পারে। কিন্তু ব্যবসার কাজ বাড়লে তার সীমাবদ্ধতা সামনে আসে। যেমন, হাবস্পটের বিনামূল্যের গ্রাহক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারে সর্বোচ্চ দুজন বিনামূল্যে ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে। ছোট একটি বিক্রয় দল এই সীমার মধ্যে কাজ করতে পারলে সমস্যা নেই। কিন্তু প্রতিষ্ঠানে আরও কর্মী যুক্ত হলে আগের পরিকল্পনা যথেষ্ট নাও হতে পারে।
একইভাবে কোনো সফটওয়্যারের বিনামূল্যের সংস্করণে সাধারণ প্রতিবেদন তৈরি করা গেলেও উন্নত বিশ্লেষণ, অতিরিক্ত তথ্য সংরক্ষণের জায়গা কিংবা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ সম্পন্ন করার সুবিধার জন্য অর্থের বিনিময়ে উন্নত সংস্করণ নিতে হতে পারে।
সফটওয়্যার কেনার আগে বিনামূল্যের সংস্করণে কী পাওয়া যাচ্ছে, সেটি অনেকেই দেখেন। কিন্তু কোন সুবিধাটি পাওয়া যাচ্ছে না, তা সব সময় গুরুত্ব পায় না। এখানে আরেকটি পার্থক্য বোঝা দরকার। সব বিনামূল্যের সফটওয়্যার এক ধরনের নয়। কিছু সফটওয়্যার ব্যবহার করতে লাইসেন্স ফি লাগে না। কিছু সেবায় সাধারণ সুবিধা বিনামূল্যে থাকলেও উন্নত সুবিধার জন্য টাকা দিতে হয়। আবার নির্দিষ্ট সময়ের বিনামূল্যের পরীক্ষামূলক ব্যবহারকে স্থায়ী বিনামূল্যের সুবিধা মনে করাও ভুল।
পরীক্ষামূলক ব্যবহারের সময় শেষ হলে কী হবে, অর্থের বিনিময়ে পরবর্তী সংস্করণ নিতে হবে কি না, কিংবা আগের তথ্য ব্যবহার করা যাবে কি না, এসব শর্ত আগে জানা ভালো। তবে সব সীমাবদ্ধতাই টাকা খরচ করে সমাধান করতে হবে, এমন নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানে যে উন্নত সুবিধাটির প্রয়োজনই নেই, সেটি না পাওয়ায় বাস্তবে কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
কর্মীদের সময় নষ্ট হচ্ছে কি না, সেটি হিসাব করুন

ছোট ব্যবসায় সফটওয়্যারের খরচ হিসাব করার সময় কর্মীদের সময় অনেক ক্ষেত্রেই বাদ পড়ে যায়। নতুন কোনো গ্রাহক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা বা হিসাবরক্ষণের সফটওয়্যার চালু করলে সেটি ব্যবহার করা শিখতে হবে। একজন কর্মী দ্রুত বুঝতে পারেন, অন্যজনের কয়েকবার সাহায্য লাগতে পারে। নতুন কর্মী যোগ হলে আবার প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হবে।
অবশ্য অর্থের বিনিময়ে কেনা সফটওয়্যারেও প্রশিক্ষণ লাগে। ফলে শেখার জন্য সময় লাগছে বলেই বিনামূল্যের সফটওয়্যারকে ব্যয়বহুল বলা যায় না। দেখার বিষয় হলো, শেখার পর কাজটি আগের চেয়ে সহজ হচ্ছে কি না।
একটি প্রতিষ্ঠানে পাঁচজন কর্মী একই সফটওয়্যার ব্যবহার করছেন। প্রত্যেকে নিয়মিত তথ্য লিখছেন, কিন্তু মাস শেষে প্রতিবেদন তৈরির সময় একজনকে আবার সব তথ্য মিলিয়ে দেখতে হচ্ছে। তখন সফটওয়্যারটি কতটা কাজ সহজ করছে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। প্রশিক্ষণের খরচের পাশাপাশি এ ধরনের পুনরাবৃত্ত কাজের সময়ও হিসাব করা দরকার।
একাধিক বিনামূল্যের সফটওয়্যার ব্যবহার করলে ঝামেলা বাড়তে পারে
সব প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি সফটওয়্যার যথেষ্ট নয়। ওয়েবসাইট, অর্ডার, মজুত পণ্যের হিসাব, হিসাবরক্ষণ ও গ্রাহক ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা সফটওয়্যার লাগতে পারে। সমস্যা হয় যখন এসব সফটওয়্যার একে অপরের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে না। একটি পণ্য বিক্রি হওয়ার পর মজুত পণ্যের হিসাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তন না হলে কর্মীকে সেটি হাতে সংশোধন করতে হবে। সংশোধন করতে ভুলে গেলে অন্য কর্মী পুরোনো হিসাব দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
কিছু বিনামূল্যের সফটওয়্যারে অন্য সফটওয়্যারের সঙ্গে সংযোগ তৈরি বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করার সুবিধা সীমিত থাকে। আবার কিছু ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষের সফটওয়্যার যুক্ত করতে কিংবা বিশেষ কাজের জন্য সফটওয়্যার নির্মাতার সহায়তা নিতে হয়।
সেই খরচও ব্যবসার হিসাবের মধ্যে আসবে। তবে এখানে নতুন সফটওয়্যার কেনার আগে একটি বিষয় দেখা উচিত। বিদ্যমান সফটওয়্যারে কাজটি করার কোনো ব্যবস্থা রয়েছে কি না। অনেক সময় সফটওয়্যার পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না, কাজের পদ্ধতি একটু বদলালেই চলে।
ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কত দিন পাওয়া যাবে?
বিনামূল্যের সফটওয়্যারের আরেকটি সমস্যা সামনে আসে পুরোনো তথ্যের প্রয়োজন হলে। কর্মীদের যোগাযোগের জন্য স্ল্যাক ব্যবহার করা হচ্ছে, এমন একটি প্রতিষ্ঠানের কথা ধরা যাক। প্রকল্পের সিদ্ধান্ত, গ্রাহকের নির্দেশনা, কাজের পরিবর্তন নিয়ে সেখানে নিয়মিত আলোচনা হয়। স্ল্যাকের বিনামূল্যের সংস্করণে সর্বশেষ ৯০ দিনের বার্তা ও ফাইল দেখা এবং খোঁজা যায়। এর চেয়ে পুরোনো তথ্য ব্যবহারকারীদের কাছে অদৃশ্য থাকে।
তথ্য সংরক্ষণেরও সময়সীমা রয়েছে। বিনামূল্যের যৌথ কর্মপরিসরে এক বছরের বেশি পুরোনো বার্তা ও ফাইল পর্যায়ক্রমে স্থায়ীভাবে মুছে ফেলা হয়। আবার সেই কর্মপরিসরের মালিক চাইলে ৯০ দিন পর তথ্য মুছে ফেলার নিয়মও নির্বাচন করতে পারেন।
ফলে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের নথি শুধু সেখানে রাখলে পরে সেটি পাওয়া নাও যেতে পারে। স্ল্যাকের এই নিয়ম সব বিনামূল্যের সফটওয়্যারের জন্য প্রযোজ্য নয়। তবে উদাহরণটি দেখায়, তথ্য সংরক্ষণের শর্ত না পড়ে সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর করা কতটা অসুবিধাজনক হতে পারে। একই বিষয় প্রযোজ্য গ্রাহকের তথ্য, অর্ডারের ইতিহাস কিংবা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ নথির ক্ষেত্রে। তথ্য রাখা যাচ্ছে, কিন্তু প্রয়োজনে সেটি বের করা যাবে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা দরকার।
সফটওয়্যার বদলানোর সময় যে সমস্যাটি বোঝা যায়
একটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বিনামূল্যের গ্রাহক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার ব্যবহার করার পর অন্য সফটওয়্যারে যেতে চাইছে। তখন শুধু গ্রাহকের নাম ও ফোন নম্বর স্থানান্তর করলেই কাজ শেষ হবে না। আগের যোগাযোগের ইতিহাস, সংযুক্ত নথি, মন্তব্য কিংবা স্বয়ংক্রিয় কাজের নিয়মও প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সব সফটওয়্যার এসব তথ্য একইভাবে বাইরে নেওয়ার সুযোগ দেয় না।
কিছু ক্ষেত্রে বিস্তারিত তথ্য বাইরে নেওয়ার জন্য অর্থের বিনিময়ে উন্নত সংস্করণ প্রয়োজন হয়। অন্য কোথাও সাধারণ তথ্য বের করা গেলেও নতুন সফটওয়্যারে তা ঠিকভাবে বসাতে বাড়তি কাজ করতে হয়। একটি সফটওয়্যার থেকে অন্যটিতে যাওয়ার এই জটিলতাকে নির্দিষ্ট সফটওয়্যার সরবরাহকারীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বলা হয়।
ব্যবসার জন্য সমস্যাটি বাস্তব। পুরোনো তথ্য সাজানো, নতুন সফটওয়্যারে নেওয়া, ভুল সংশোধন এবং কর্মীদের আবার প্রশিক্ষণ দেওয়ার পেছনে সময় ও অর্থ ব্যয় হতে পারে। এ কারণেই শুরুতে অল্প কিছু নমুনা তথ্য অন্য জায়গায় নেওয়ার পরীক্ষা করা ভালো। কয়েক বছর পর সফটওয়্যার বদলানোর সময় প্রথমবার এই সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে সেটি অনেক বেশি সুবিধাজনক।
বিনামূল্যের সফটওয়্যারের নিরাপত্তা নিয়ে প্রচলিত ধারণা কতটা ঠিক?
বিনামূল্যের সফটওয়্যার অনিরাপদ এবং অর্থের বিনিময়ে কেনা সফটওয়্যার নিরাপদ, এমন সরল বিভাজন করা যায় না। অনেক প্রতিষ্ঠিত বিনামূল্যের সেবায় ভালো নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে। আবার অর্থের বিনিময়ে কেনা সফটওয়্যার ব্যবহার করেও দুর্বল পাসওয়ার্ড, ভুল অনুমতি কিংবা কর্মীদের অসতর্কতার কারণে তথ্য হারানো সম্ভব।
একটি ছোট ব্যবসায় সবাই একই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করলে কে কোন তথ্য পরিবর্তন করেছেন, তা বোঝা কঠিন হতে পারে। কোনো কর্মী প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যাওয়ার পরও তাঁর প্রবেশাধিকার চালু থাকলে সেটিও ঝুঁকি তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট ছোট ব্যবসার জন্য একাধিক ধাপে পরিচয় যাচাই, নিয়মিত সফটওয়্যার হালনাগাদ এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের নিরাপদ অনুলিপি রাখার পরামর্শ দেয়।
এসব ব্যবস্থা চালু করতে সব সময় নতুন সফটওয়্যার কিনতে হয় না। কিন্তু কে কোন তথ্য ব্যবহার করতে পারবেন, নিরাপদ অনুলিপি রাখার দায়িত্ব কার এবং ভুল করে তথ্য মুছে গেলে কীভাবে ফেরত আনা হবে, তা ঠিক করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে গ্রাহকের ফোন নম্বর, ঠিকানা, লেনদেনের তথ্য কিংবা ব্যবসায়িক নথি রাখার ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। নিরাপত্তা ঘটনার পর তথ্য পুনরুদ্ধার, কারিগরি বিশেষজ্ঞের সহায়তা কিংবা ব্যবসার কাজ বন্ধ থাকার কারণে খরচ হতে পারে। অবশ্য সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি এক রকম হবে না। সেটি নির্ভর করে কী তথ্য হারিয়েছে এবং ব্যবসার কাজে তার প্রভাব কতটা।
কারিগরি সহায়তা না পাওয়াও খরচের কারণ

একটি সফটওয়্যার ঠিকমতো কাজ করলে সেটির সহায়তা ব্যবস্থা নিয়ে খুব বেশি ভাবতে হয় না। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সফটওয়্যারে সমস্যা দেখা দিলে পরিস্থিতি বদলে যায়। ধরা যাক, একটি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়ের তথ্য দেখা যাচ্ছে না। কর্মীরা নিজেরা সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছেন। এদিকে অর্ডার প্রক্রিয়াকরণ আটকে আছে।
বিনামূল্যের অনেক সফটওয়্যারে ব্যবহারকারীদের আলোচনা ও প্রশ্নোত্তরের জায়গা এবং সহায়তামূলক নিবন্ধ পাওয়া যায়। সাধারণ সমস্যা সমাধানের জন্য সেগুলো যথেষ্ট হতে পারে। তবে সরাসরি কারিগরি সহায়তা কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সাড়া পাওয়ার নিশ্চয়তা সব বিনামূল্যের সংস্করণে নেই।
কিছু অর্থের বিনিময়ে পাওয়া সফটওয়্যারে সেবার মান ও সহায়তার সময়সীমা নিয়ে লিখিত চুক্তি থাকে। যদিও দ্রুত সাড়া দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মানেই দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে, এমন নয়।
প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ যদি একটি সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর করে, তাহলে সহায়তার শর্ত জানা দরকার। সফটওয়্যার সাময়িক বন্ধ থাকলে বিকল্পভাবে কাজ চালানোর ব্যবস্থাও থাকা উচিত।
ব্যক্তিগত ব্যবহারের বিনামূল্যের লাইসেন্স ব্যবসার জন্য নাও হতে পারে
লাইসেন্সের শর্ত না পড়ে সফটওয়্যার ব্যবহার করাও ছোট ব্যবসার জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে টিমভিউয়ারের বিনামূল্যের সংস্করণ ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত। অফিসের কম্পিউটারে সংযোগ, সহকর্মীদের সহায়তা কিংবা গ্রাহককে বাণিজ্যিক সেবা দেওয়ার মতো কাজে উপযুক্ত অর্থের বিনিময়ে পাওয়া লাইসেন্স প্রয়োজন হয়।
ফলে কোনো সফটওয়্যার নিজের কম্পিউটারে বিনামূল্যে ব্যবহার করা যাচ্ছে বলেই সেটি প্রতিষ্ঠানের কাজেও বিনামূল্যে ব্যবহার করা যাবে, এমন নয়।
মুক্ত উৎসের সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। প্রকৃত মুক্ত উৎসের সফটওয়্যারের লাইসেন্স বাণিজ্যিক ব্যবহার অনুমোদন করে। তবে সফটওয়্যার পরিবর্তন ও বিতরণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সের শর্ত মানতে হয়।
আবার মুক্ত উৎসের সফটওয়্যার মানেই পরিচালনার কোনো খরচ নেই, সেটিও ঠিক নয়।
নিজস্ব সার্ভারে সফটওয়্যার চালাতে হলে সেটি রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। নিরাপত্তা হালনাগাদ, তথ্যের নিরাপদ অনুলিপি এবং সমস্যা সমাধানের জন্য দক্ষ কর্মী প্রয়োজন হতে পারে। প্রতিষ্ঠানে সেই দক্ষতা না থাকলে বাইরে থেকে সহায়তা নিতে হবে। তাই শুধু লাইসেন্স ফি বাঁচানোর জন্য মুক্ত উৎসের সফটওয়্যার বেছে নেওয়া সব ব্যবসার জন্য লাভজনক হবে না।
আরও পড়ুন: ছোট ব্যবসার সফটওয়্যার স্ট্যাক (Software Stack) কীভাবে পরিকল্পনা করবেন
বাংলাদেশ ও ভারতের ছোট ব্যবসায় আরও কিছু বিষয় মাথায় রাখা দরকার
আন্তর্জাতিক সফটওয়্যারের বিজ্ঞাপনে যে দাম দেখা যায়, সেটিই সব সময় চূড়ান্ত খরচ নয়। বাংলাদেশ কিংবা ভারত থেকে বিদেশি মুদ্রায় নিয়মিত সফটওয়্যার ব্যবহারের ফি পরিশোধ করলে প্রযোজ্য কর, ব্যাংকের চার্জ এবং মুদ্রা রূপান্তরের খরচ যুক্ত হতে পারে। কত টাকা বাড়বে, তা ব্যাংক ও পেমেন্ট পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে।
ইন্টারনেট সংযোগের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। যেসব প্রতিষ্ঠানে সংযোগ অনিয়মিত, সেখানে পুরোপুরি ইন্টারনেটনির্ভর সফটওয়্যার ব্যবহার করতে অসুবিধা হতে পারে। ইন্টারনেট ছাড়াই কাজ করা যায় কি না এবং পরে তথ্য ঠিকভাবে সমন্বয় হয় কি না, সেটি দেখা প্রয়োজন।
স্থানীয় হিসাবরক্ষণ, চালান তৈরি কিংবা প্রচলিত অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থার সঙ্গে সফটওয়্যারের সামঞ্জস্য না থাকলে আলাদা ব্যবস্থা করতে হতে পারে। এতে কাজের সময় ও পরিচালন ব্যয় বাড়বে। গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য রাখার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইনও বিবেচনায় নিতে হবে। বাংলাদেশে ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৬ প্রণীত হয়েছে। অন্যদিকে ভারতে ডিজিটাল ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৩ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা রয়েছে, যার বিভিন্ন বিধানের কার্যকারিতা পর্যায়ক্রমে নির্ধারিত।
বিদেশি সার্ভারে তথ্য রাখলেই আইন ভঙ্গ হবে, এমন নয়। কিন্তু কোন ধরনের তথ্য রাখা হচ্ছে, কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং ব্যবসার ওপর কোন নিয়ম প্রযোজ্য, তা যাচাই করা প্রয়োজন। সংবেদনশীল বা নিয়ন্ত্রিত তথ্যের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মোট খরচের হিসাব না করলে বিনামূল্যের ও অর্থের বিনিময়ে পাওয়া সফটওয়্যারের তুলনা ঠিক হবে না
সফটওয়্যারের প্রকৃত খরচ বোঝার জন্য মোট মালিকানা ব্যয় হিসাবের পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়। নামটি একটু কারিগরি শোনালেও হিসাবের বিষয়টি সহজ। শুধু সফটওয়্যার কেনার খরচ নয়, সেটি চালাতে কী কী ব্যয় হচ্ছে, তা একসঙ্গে দেখতে হবে।
ধরা যাক, একটি বিনামূল্যের সফটওয়্যার ব্যবহার করতে কর্মীদের নিয়মিত তথ্য সংশোধন করতে হয়। অন্যদিকে অর্থের বিনিময়ে পাওয়া একটি সফটওয়্যারে সেই কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করা যায়। তখন মাসিক ব্যবহারের ফির সঙ্গে কর্মীদের কত সময় বাঁচবে এবং নতুন সফটওয়্যার চালু করতে কত খরচ হবে, সেগুলো তুলনা করতে হবে।
নিজের প্রতিষ্ঠানের জন্য পাঁচটি খাত আলাদা করে হিসাব রাখলেই শুরু করা যায়।
- সফটওয়্যারের লাইসেন্স ও নিয়মিত ব্যবহারের ফি।
- কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত অতিরিক্ত কাজের সময়।
- স্বয়ংক্রিয় কাজের ব্যবস্থা, সফটওয়্যার সংযোগ ও প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন।
- নিরাপত্তা, তথ্যের নিরাপদ অনুলিপি, সার্ভার ও কারিগরি সহায়তা।
- পরে সফটওয়্যার পরিবর্তন ও তথ্য স্থানান্তরের সম্ভাব্য খরচ।
তবে একই ব্যয় যেন দুবার হিসাবে না আসে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
কর্মীদের সময় বাঁচার অর্থ সব ক্ষেত্রে নগদ খরচ কমা নয়। একই বেতনে কাজ করা কর্মী কম সময়ে কাজ শেষ করলে সেই সময় অন্য উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করতে পারবেন। এর অর্থনৈতিক মূল্য আছে, কিন্তু সেটিকে সরাসরি কমে যাওয়া নগদ ব্যয় হিসেবে দেখানো ঠিক হবে না। এক বছরের পাশাপাশি তিন বছরের সম্ভাব্য খরচ দেখলে ব্যবসা বাড়ার প্রভাবও বোঝা সহজ হয়।
কখন অর্থের বিনিময়ে সফটওয়্যার নেওয়া যুক্তিসংগত?
একটি ছোট ব্যবসায় কর্মী কম, কাজের ধরন সাধারণ এবং উন্নত সুবিধার প্রয়োজন নেই। এমন অবস্থায় বিনামূল্যের সফটওয়্যার দিয়ে কাজ ভালোভাবে চললে সেটি পরিবর্তন করার কারণ নেই। কিন্তু সফটওয়্যারের সীমাবদ্ধতার কারণে নিয়মিত কাজ আটকে গেলে বিষয়টি নতুন করে ভাবতে হবে।
বিশেষ করে অতিরিক্ত কর্মী যুক্ত করা যাচ্ছে না, প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন পাওয়া যাচ্ছে না, একই তথ্য বারবার লিখতে হচ্ছে কিংবা কারিগরি সমস্যার কারণে ব্যবসার কাজ বন্ধ থাকছে, এমন পরিস্থিতিতে অর্থের বিনিময়ে পাওয়া বিকল্পের খরচ তুলনা করা যুক্তিসংগত।
অর্থের বিনিময়ে সফটওয়্যার নেওয়ার আগে অবশ্য বর্তমান সফটওয়্যারের সুবিধাগুলো ভালোভাবে পরীক্ষা করা দরকার। অনেক সময় বিদ্যমান সুবিধা দিয়েই সমস্যার সমাধান সম্ভব।
আর মুক্ত উৎসের সফটওয়্যারের দিকে যেতে চাইলে দেখতে হবে, প্রতিষ্ঠান সেটি পরিচালনা করতে পারবে কি না। দক্ষ কর্মী বা নির্ভরযোগ্য কারিগরি সহায়তা ছাড়া মুক্ত উৎসের সফটওয়্যার চালানোর খরচ প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হতে পারে। ব্যবসার জন্য কোনটি ভালো হবে, তা নির্ধারণ করতে সফটওয়্যারের বিজ্ঞাপনের চেয়ে নিজের কাজের হিসাব বেশি কাজে আসবে।
বিনামূল্যের সুবিধা ধরে রাখতে গিয়ে বেশি খরচ হচ্ছে কি?
বিনামূল্যের সফটওয়্যার ব্যবহার বন্ধ করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। যত দিন সেটি ব্যবসার প্রয়োজনীয় কাজ ঠিকভাবে করতে পারছে, তত দিন ব্যবহার চালিয়ে যাওয়া যুক্তিসংগত। তবে কর্মীদের নিয়মিত অতিরিক্ত সময় দিতে হচ্ছে, তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কাজ সফটওয়্যারের সীমাবদ্ধতায় আটকে থাকছে, এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে হিসাব করা দরকার।
বিনামূল্যের ব্যবসায়িক সফটওয়্যারের অদৃশ্য খরচ কমাতে প্রথমে দেখুন, সফটওয়্যারটি ব্যবহার করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানের কোথায় সময় ও অর্থ বেশি ব্যয় হচ্ছে। তারপর সেই সমস্যা বর্তমান ব্যবস্থায় সমাধান করা সম্ভব কি না পরীক্ষা করুন।
সমাধান সম্ভব না হলে অর্থের বিনিময়ে পাওয়া কিংবা মুক্ত উৎসের সফটওয়্যার বিবেচনা করুন। নতুন সফটওয়্যারের খরচের সঙ্গে পুরোনো তথ্য স্থানান্তর এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যয়ও ধরতে হবে।
ছোট ব্যবসার জন্য বিনামূল্যের সফটওয়্যার খারাপ পছন্দ নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রেই এটিই সবচেয়ে সাশ্রয়ী ব্যবস্থা। কিন্তু ব্যবসার প্রয়োজন বদলে যাওয়ার পরও শুধু বিনামূল্যে পাওয়া যাচ্ছে বলে একটি সফটওয়্যার ধরে রাখা সব সময় লাভজনক হয় না। সফটওয়্যারটির জন্য কত টাকা দিতে হচ্ছে, তার পাশাপাশি সেটি দিয়ে কাজ শেষ করতে কত সময় ও খরচ হচ্ছে, সেই হিসাবটাই শেষ পর্যন্ত বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
১. ছোট ব্যবসার জন্য বিনামূল্যের সফটওয়্যার কি দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক?
হতে পারে। ব্যবসার প্রয়োজনীয় কাজগুলো যদি বিনামূল্যের সফটওয়্যার দিয়ে ঠিকভাবে করা যায়, তাহলে নিয়মিত খরচ অনেকটাই কম রাখা সম্ভব। তবে কর্মীদের সংখ্যা বাড়লে, অতিরিক্ত সুবিধার প্রয়োজন হলে কিংবা একই কাজ বারবার করতে হলে পরিচালনার খরচ বেড়ে যেতে পারে। তাই শুধু সফটওয়্যারের দাম নয়, সেটি ব্যবহার করতে কত সময় ও শ্রম লাগছে, সেটিও হিসাব করা উচিত।
২. সফটওয়্যারের বিনামূল্যের পরীক্ষামূলক ব্যবহারের সময় শেষ হলে কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে টাকা কাটা হয়?
এটি সফটওয়্যার সরবরাহকারীর শর্তের ওপর নির্ভর করে। কিছু সেবায় পরীক্ষামূলক ব্যবহারের সময় শেষ হলে বিনামূল্যের সুবিধা বন্ধ হয়ে যায়। আবার কিছু সেবায় আগে থেকে অর্থ পরিশোধের তথ্য দেওয়া থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থের বিনিময়ে ব্যবহারের মেয়াদ শুরু হতে পারে। তাই পরীক্ষামূলক ব্যবহার চালুর আগে মেয়াদ, স্বয়ংক্রিয় নবায়ন এবং বাতিল করার নিয়ম পড়ে নেওয়া ভালো।
৩. বিনামূল্যের সফটওয়্যারে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক তথ্য রাখলে আলাদা নিরাপদ অনুলিপি প্রয়োজন?
গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের আলাদা নিরাপদ অনুলিপি রাখা ভালো। সফটওয়্যারের নিজস্ব তথ্য সংরক্ষণব্যবস্থা থাকলেও ভুল করে তথ্য মুছে যাওয়া, অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে না পারা কিংবা সেবার নীতিমালা পরিবর্তনের কারণে সমস্যা হতে পারে। তথ্যের অনুলিপি রাখার পাশাপাশি প্রয়োজনের সময় সেটি ফিরিয়ে আনা যায় কি না, তা পরীক্ষা করাও জরুরি।
৪. একসঙ্গে একাধিক বিনামূল্যের সফটওয়্যার ব্যবহার করা কি ছোট ব্যবসার জন্য ভালো সিদ্ধান্ত?
কাজের ধরন অনুযায়ী একাধিক বিনামূল্যের সফটওয়্যার ব্যবহার করা যুক্তিসংগত হতে পারে। তবে একই তথ্য বারবার লিখতে হলে কিংবা সফটওয়্যারগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান না হলে কর্মীদের বাড়তি সময় দিতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যমান সফটওয়্যারগুলোর সংযোগের ব্যবস্থা পরীক্ষা করা বা একটি সমন্বিত সফটওয়্যার ব্যবহারের খরচ তুলনা করা ভালো।
৫. ব্যবসার সফটওয়্যার ব্যবহারের খরচ কত দিন পরপর পর্যালোচনা করা উচিত?
প্রতি তিন বা ছয় মাস পরপর একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা করা ব্যবহারিক সিদ্ধান্ত হতে পারে। তবে কর্মীসংখ্যা বাড়লে, নতুন ব্যবসায়িক কাজ যুক্ত হলে কিংবা সফটওয়্যারের ব্যবহারসীমা পরিবর্তিত হলে আগেই হিসাব দেখা উচিত। কোন কাজে বেশি সময় যাচ্ছে, কোন সুবিধা প্রয়োজন হচ্ছে এবং পেইড বিকল্পে গেলে কত খরচ হবে, তা তুলনা করলেই বোঝা যাবে বর্তমান সফটওয়্যারটি এখনও সাশ্রয়ী কি না।


