ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর: যে সাগরের জলে ধুয়ে যায় অর্থহীন প্রথা আর কুসংস্কারের জঞ্জাল

সর্বাধিক আলোচিত

উনিশ শতকের বাঙালি সমাজ শতবর্ষী অর্থহীন প্রথা আর কুসংস্কারের জঞ্জালে স্থবির আর অচল প্রায় হয়ে পড়েছিল। তখন গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ ছিল, পালকির শব্দ ছিল, আর ছিল জমিদারি অহংকার, ধর্মীয় গোঁড়ামি আর সামাজিক ভয়ের অদৃশ্য দেয়াল। সেই দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন একজন সাধারণ মানুষ। তাঁর পরনের পোশাক ছিল সাধারণ, আটপৌরে; কিন্তু চোখে ছিল অদম্য এক আলো। তিনি একাই দাঁড়িয়েছিলেন ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুপ্রথা আর শক্তিশালী সামন্তবাদী শক্তির বিপক্ষে।

মানুষটির নাম ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। অবশ্য ইতিহাস তাঁর নাম লিখেছে ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর’ হিসেবে।

“বিদ্যাসাগর”—নামটি শুধু একটি উপাধি নয়। এর মধ্যে মিশে আছে জ্ঞানের গভীরতা, মানবিকতার বিস্তার এবং অন্যায়ের সামনে মাথা না নোয়ানোর এক বিরল সাহস। সংস্কৃত শিক্ষায় অসাধারণ দক্ষতার জন্য পাওয়া এই উপাধি পরবর্তী সময়ে আরও বড় অর্থ বহন করে। তিনি শুধু পুঁথিগত জ্ঞানের বাহক ছিলেন না; তিনি ছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি জ্ঞানকে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।

আজও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মবার্ষিকী আমাদের সামনে শুধু একটি ঐতিহাসিক স্মরণদিবস হয়ে আসে না। এটি এক ধরনের আত্মসমীক্ষার মুহূর্ত। যে সমাজে তিনি বিধবা বিবাহের জন্য লড়েছিলেন, যে সমাজে নারী শিক্ষার পথ খুলতে তাঁকে অপমান সহ্য করতে হয়েছিল, সেই সমাজ কতটা বদলেছে? আর কতটা একই অন্ধকারের মধ্যে আটকে আছে?

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সারাজীবন সমাজকে প্রশ্ন করে গেছেন—শিক্ষা কি শুধু পরীক্ষার ফল, নাকি মানুষের চোখ খুলে দেওয়ার আলো? ধর্ম কি শুধু আচার, নাকি তার কেন্দ্রে থাকা উচিত করুণা? সমাজ কি শুধু প্রথা রক্ষা করবে, নাকি অন্যায় প্রথাকে প্রশ্ন করার সাহসও দেখাবে?

নিজের সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েও তিনি ভবিষ্যতের জন্য পথ তৈরি করে গেছেন।

বীরসিংহের মাটি: যেখানে জন্ম নিয়েছিল এক অদম্য মন

মেদিনীপুরের বীরসিংহ গ্রাম। ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারের ছোট্ট ঘরে জন্ম নিয়েছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।

তাঁর বাবা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারের মানুষ। সংসারে অর্থ ছিল না, কিন্তু শিক্ষার প্রতি এক অদম্য আকর্ষণ ছিল।

শিশু ঈশ্বরচন্দ্রের চোখে তখন পৃথিবী ছিল খুব ছোট। গ্রামের মাঠ, পুকুর, মাটির উঠান—এই ছিল তাঁর পরিচিত জগৎ। কিন্তু সেই ছোট জগতের ভেতরেই ছিল বড় হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।

ঠাকুরদাস বুঝেছিলেন, এই ছেলেকে গ্রামের গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখা যাবে না। শিক্ষার জন্য তাঁকে কলকাতায় পাঠাতে হবে। কিন্তু কলকাতা তখন দূরের এক অচেনা নগর। সেখানে যাওয়ার অর্থ ছিল অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়ানো।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর জীবনী

শোনা যায়, কলকাতায় যাওয়ার পথে ছোট্ট ঈশ্বরচন্দ্র রাস্তার ধারে মাইলফলকের ইংরেজি সংখ্যা দেখে দেখে অক্ষর চিনতে শুরু করেছিলেন। ঘটনাটি শুধু একটি শিশুর মেধার গল্প নয়; এটি তাঁর শেখার ক্ষুধার প্রতীক। যে শিশু পথের ধুলোয় দাঁড়িয়ে জ্ঞান খুঁজে নেয়, তাকে কোনো দেয়াল বেশিদিন আটকে রাখতে পারে না।

কলকাতায় এসে শুরু হয় কঠিন জীবন। অর্থের অভাব ছিল, থাকার কষ্ট ছিল, কিন্তু পড়ার ইচ্ছায় কোনো ঘাটতি ছিল না। দিনের পর দিন তিনি সংগ্রাম করেছেন। কখনও অল্প খাবারে দিন কেটেছে, কখনও অন্ধকার ঘরে বসে পড়তে হয়েছে। কিন্তু বই তাঁর কাছে কেবল পরীক্ষার মাধ্যম ছিল না; বই ছিল মুক্তির দরজা।

প্রচলিত একটি কাহিনি আছে—রাস্তার ধারে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় দাঁড়িয়ে তিনি পড়াশোনা করতেন, কারণ ঘরে পর্যাপ্ত আলো জ্বালানোর সামর্থ্য ছিল না। এই গল্পটি ইতিহাসের প্রতিটি খুঁটিনাটি দিয়ে প্রমাণিত না হলেও, এটি তাঁর সংগ্রামী ছাত্রজীবনের প্রতীক হয়ে আছে।

সংগ্রাম তাঁকে ভেঙে দেয়নি। বরং তৈরি করেছে।

সংস্কৃত কলেজে তাঁর অসাধারণ মেধা দ্রুত সবার নজরে আসে। ব্যাকরণ, সাহিত্য, দর্শন—সব ক্ষেত্রেই তিনি নিজের প্রতিভার পরিচয় দেন। ১৮৩৯ সালে সংস্কৃত শিক্ষায় বিশেষ কৃতিত্বের জন্য তিনি “বিদ্যাসাগর” উপাধি লাভ করেন।

ইতিহাসের সৌন্দর্য এখানেই—যে উপাধি তাঁকে দেওয়া হয়েছিল তাঁর জ্ঞানের জন্য, তিনি পরে সেই জ্ঞানকে মানুষের মুক্তির অস্ত্রে পরিণত করেছিলেন।

সংস্কৃত কলেজ থেকে সংস্কারের পথে

সংস্কৃত কলেজ ছিল তখন বাংলার উচ্চশিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। কিন্তু উনিশ শতকের সেই শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেও ছিল অনেক সীমাবদ্ধতা। জ্ঞান অনেক সময় নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। সংস্কৃত কলেজ ছিল ঐতিহ্যের দুর্গ। সেখানে বহুদিন ধরে চলে আসা নিয়ম, শ্রেণিবিভাজন এবং রক্ষণশীলতার প্রভাব ছিল প্রবল। ঈশ্বরচন্দ্র সেই পরিবেশের মধ্যেই দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। শিক্ষার দরজা আরও মানুষের জন্য খুলতে হবে। কেবল জন্মপরিচয়ের ভিত্তিতে জ্ঞানের অধিকার নির্ধারণ করা যায় না।

ঈশ্বরচন্দ্র এই কাঠামোর ভেতর থেকেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছিলেন।

সংস্কৃত কলেজে তাঁর ছাত্রজীবন তাঁকে শুধু প্রাচীন শাস্ত্রের সঙ্গে পরিচিত করেনি, বরং যুক্তি ও বিশ্লেষণের ক্ষমতাও তৈরি করেছিল। ঈশ্বরচন্দ্র খুব দ্রুত বুঝেছিলেন, শুধু শাস্ত্র জানা যথেষ্ট নয়। সমাজকে বুঝতে হবে। মানুষের জীবনকে বুঝতে হবে। কারণ এমন শিক্ষা, যা মানুষের চোখের জল দেখতে পায় না, তা অর্ধেক শিক্ষা।

১৮৪১ সালে তিনি সংস্কৃত কলেজ থেকে শিক্ষা শেষ করার পর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে সংস্কৃত বিভাগের প্রধান পণ্ডিত হিসেবে যোগ দেন। পরে সংস্কৃত কলেজের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আরও গভীর হয়। প্রশাসনিক দায়িত্বে থেকেও তিনি শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের চেষ্টা করেন। প্রতিষ্ঠান তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। কারণ তাঁর কাছে প্রতিষ্ঠান ছিল মানুষের জন্য, মানুষ প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়।

তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্পষ্ট। শিক্ষা যদি মানুষের চিন্তাকে মুক্ত না করে, তবে সেই শিক্ষা কেবল মুখস্থ বিদ্যা হয়ে থাকে।

সংস্কৃত কলেজে তিনি পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন। আধুনিক বিষয়, ব্যবহারিক জ্ঞান এবং যুক্তিনির্ভর শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন। এই পরিবর্তনের চেষ্টা অনেকের কাছে অস্বস্তিকর ছিল। কারণ যে কোনো পুরোনো ব্যবস্থায় নতুন চিন্তা প্রথমে প্রতিরোধের মুখেই পড়ে।

কিন্তু বিদ্যাসাগর আপস করার মানুষ ছিলেন না।

তিনি প্রতিষ্ঠানকে সম্মান করতেন, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতাকে প্রশ্ন করতেও দ্বিধা করতেন না। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল সমাজ পরিবর্তনের প্রথম দরজা।

বিধবা বিবাহ আন্দোলন: শুধু সংস্কার নয়, মানবতার লড়াই

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে আলোচিত সমাজ সংস্কারের মধ্যে বিধবা বিবাহ আন্দোলন একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। কিন্তু এটি শুধু একটি আইন পরিবর্তনের গল্প নয়। এটি ছিল অসংখ্য নারীর নীরব কান্নার বিরুদ্ধে এক মানুষের দাঁড়িয়ে যাওয়ার গল্প।

বিধবা বিবাহ কী ছিল?

উনিশ শতকের বাংলায় বহু নারী অল্প বয়সেই বিধবা হতেন। স্বামী মারা গেলে তাঁদের জীবন যেন সামাজিকভাবে শেষ হয়ে যেত। রঙিন পোশাক নিষিদ্ধ, আনন্দ নিষিদ্ধ, নতুন জীবনের স্বপ্ন নিষিদ্ধ। একজন জীবন্ত মানুষকে সমাজ ধীরে ধীরে একটি ছায়ায় পরিণত করত।

বিদ্যাসাগর এই অন্যায়কে শুধু অনুভব করেননি, এর বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন।

তিনি সংস্কৃত শাস্ত্র গভীরভাবে অধ্যয়ন করে দেখানোর চেষ্টা করেন যে বিধবা বিবাহের বিরুদ্ধে প্রচলিত অনেক ধারণার ধর্মীয় ভিত্তি দুর্বল। তাঁর লেখা ও যুক্তি সমাজের রক্ষণশীল অংশকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানায়।

বিধবা বিবাহ আন্দোলন ছিল এমন একটি সামাজিক ও আইনগত প্রচেষ্টা, যার লক্ষ্য ছিল হিন্দু বিধবাদের পুনরায় বিবাহের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু এই লড়াই সহজ ছিল না।

তাঁকে কটূক্তি শুনতে হয়েছে। বিরোধীরা তাঁর বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়েছে। সমাজের একটি শক্তিশালী অংশ তাঁকে অপমান করেছে। এমনকি তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তাও প্রশ্নের মুখে পড়েছিল।

তবু তিনি পিছিয়ে যাননি।

১৮৫৬ সালে বিধবা পুনর্বিবাহ আইন পাশ হওয়ার পরও বাস্তব পরিবর্তন আনতে তাঁকে নিজের অর্থ ব্যয় করতে হয়েছিল। বহু বিধবা বিবাহের আয়োজন ও সহায়তার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। ১৮৫৬ সালের ৭ ডিসেম্বর বিদ্যাসাগর নিজে উপস্থিত থেকে উত্তর কলকাতার সুকিয়া স্ট্রিটে তাঁর বন্ধু রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে প্রথম বিধবা বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন। তিনি জানতেন, শুধু আইন করলেই সমাজ বদলায় না; মানুষের মন বদলানোও জরুরি। ১৮৭০ সালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর পুত্র নারায়ণচন্দ্রের বিয়ে দেন এক বিধবার সঙ্গে।

বিধবা বিবাহ আন্দোলন তাঁর কাছে কেবল একটি সামাজিক সংস্কার ছিল না। এটি ছিল একজন মানুষের আরেকজন মানুষের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহ: যে লড়াই নিজের সমাজের বিরুদ্ধে

বিদ্যাসাগরের সংগ্রাম শুধু বিধবা বিবাহেই থেমে থাকেনি। তিনি সমাজের ভেতরে থাকা আরও অনেক অসঙ্গতির বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন।

ঊনবিংশ শতকের বাংলায় কুলীন ব্রাহ্মণ সমাজে বহুবিবাহ একটি বড় সমস্যা ছিল। অনেক ক্ষেত্রে বয়স্ক পুরুষরা একাধিক অল্পবয়সি নারীকে বিয়ে করতেন, কিন্তু সেই নারীদের জীবন হয়ে উঠত অবহেলা ও অনিশ্চয়তায় ভরা।

বিদ্যাসাগর এই প্রথার বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল কঠিন, কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল মানবিক।

তিনি ব্যঙ্গ ব্যবহার করতেন। কারণ কখনও কখনও হাসির আড়ালেও সমাজের গভীর অসংগতি প্রকাশ করা যায়। তাঁর লেখায় যুক্তির সঙ্গে ছিল তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ।

বাল্যবিবাহ নিয়েও তিনি গভীরভাবে চিন্তিত ছিলেন। অল্প বয়সে বিয়ে একটি শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎকে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তিনি তা বুঝেছিলেন।

তাঁর লড়াইয়ের সবচেয়ে কঠিন দিক ছিল—তিনি বাইরের কোনো শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ছিলেন না। তিনি নিজের সমাজের ভেতরের ভুল ধারণার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। নিজের প্রতিবেশীর বিরুদ্ধেই লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে।

যে মানুষ নিজের পরিচিত সমাজের বিরুদ্ধেও সত্য কথা বলতে পারেন, ইতিহাসে তাঁর অবস্থান আলাদা হয়ে যায়।

কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুক্তির তরবারি

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের লড়াইয়ের কেন্দ্রে ছিল একটি গভীর বিশ্বাস—মানুষের কল্যাণের চেয়ে বড় কোনো প্রথা হতে পারে না। তিনি ধর্মকে অস্বীকার করেননি, কিন্তু ধর্মের নামে মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অমানবিক নিয়মকে কখনও মেনে নেননি।

তাঁর সময়ে সমাজের অনেক অংশে এমন ধারণা প্রচলিত ছিল যে পুরোনো রীতি মানেই তা প্রশ্নাতীত। বিদ্যাসাগর সেই ধারণার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, শাস্ত্রের ব্যাখ্যাও মানুষের প্রয়োজন ও সময়ের সঙ্গে নতুনভাবে বোঝা যায়।

বিধবা বিবাহের পক্ষে তাঁর যুক্তি তারই উদাহরণ। তিনি বিরোধীদের মতো শুধু আবেগের ওপর নির্ভর করেননি; তিনি সংস্কৃত গ্রন্থ ঘেঁটে, শাস্ত্রের ভাষ্য বিশ্লেষণ করে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন। তাঁর পদ্ধতি ছিল আশ্চর্য রকম আধুনিক—বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্তিকে পাশাপাশি রাখা।

তবে তাঁর লড়াই ছিল না শুধুই পণ্ডিতদের সঙ্গে বিতর্কের লড়াই। এটি ছিল মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত এক সংগ্রাম।

তিনি দেখেছিলেন, কুসংস্কার শুধু চিন্তার সমস্যা নয়; এটি বাস্তব জীবনে মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়। একজন বিধবার হাসি, একজন নারীর শিক্ষা, একজন শিশুর স্বাভাবিক শৈশব—সবকিছুর ওপর যখন অন্ধ প্রথার ছায়া পড়ে, তখন নীরব থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।

বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর নৈতিক সাহস। অনেক সময় যারা শুরুতে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তারাও সামাজিক চাপের কারণে পিছিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি একা হয়ে গেলেও নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি।

এই একাকিত্বই তাঁকে আলাদা করে।

কারণ সমাজ পরিবর্তনের পথে সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত আসে তখনই, যখন একজন মানুষকে নিজের চারপাশের পরিচিত মুখগুলোর বিরুদ্ধেও সত্য কথা বলতে হয়।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সমাজ সংস্কার

বাংলা ভাষা ও নারী শিক্ষায় বিদ্যাসাগরের বিপ্লব

একটি ভাষার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে শুধু তার সাহিত্যিকদের ওপর নয়, নির্ভর করে সেই ভাষায় সাধারণ মানুষ কত সহজে জ্ঞান অর্জন করতে পারে তার ওপর। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এই সত্যটি খুব গভীরভাবে বুঝেছিলেন।

আজ যে বাংলা গদ্যকে আমরা স্বাভাবিক, পরিষ্কার ও সহজ বলে মনে করি, তার নির্মাণে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর আগে বাংলা লেখার ভাষা অনেক ক্ষেত্রে ছিল কঠিন, সংস্কৃতঘেঁষা এবং সাধারণ পাঠকের জন্য দুরূহ। বিদ্যাসাগর সেই ভাষাকে শৃঙ্খলা দিয়েছিলেন, সরলতা দিয়েছিলেন।

তাঁর লেখা বর্ণপরিচয় শুধু একটি শিশুপাঠ্য বই নয়; এটি বাংলা শিক্ষার ইতিহাসে এক মোড় পরিবর্তনের ঘটনা। অক্ষর শেখার সঙ্গে সঙ্গে শিশু যেন ভাষার সৌন্দর্য ও যুক্তির সঙ্গে পরিচিত হয়, সেই ভাবনা এর মধ্যে ছিল।

একটি শিশুর হাতে প্রথম বই কেমন হওয়া উচিত—এই প্রশ্নের উত্তর তিনি নিজের কাজের মাধ্যমে দিয়েছিলেন।

তাঁর কাছে শিক্ষা মানে শুধু পড়তে শেখা নয়। শিক্ষা মানে নিজের অবস্থাকে বুঝতে শেখা, প্রশ্ন করতে শেখা, নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া।

এই ভাবনা থেকেই তিনি নারী শিক্ষার প্রসারে এগিয়ে আসেন। উনিশ শতকের সমাজে মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে প্রবল আপত্তি ছিল। অনেকেই মনে করতেন, নারীদের পড়াশোনা সমাজের জন্য বিপজ্জনক। বিদ্যাসাগর এই ধারণার বিরুদ্ধে দাঁড়ান।

তিনি বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, একটি শিক্ষিত নারী শুধু নিজের জীবনই বদলান না, একটি পরিবার ও প্রজন্মের চিন্তাধারাকেও বদলে দিতে পারেন।

বাংলা শিক্ষা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা তাই শুধু কয়েকটি স্কুল প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি শিক্ষাকে সামাজিক মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে দেখেছিলেন।

আজও যখন আমরা শিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা করি, তখন বিদ্যাসাগরের সেই প্রশ্ন ফিরে আসে—শিক্ষা কি শুধু চাকরি পাওয়ার পথ, নাকি মানুষ হয়ে ওঠার পথ?

করুণার সাগর: পর্দার আড়ালের মানুষটি

জনসমক্ষে বিদ্যাসাগর ছিলেন কঠোর যুক্তির মানুষ। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর আরেকটি পরিচয় ছিল—অসীম মমতার মানুষ।

তাঁর সমসাময়িকদের লেখায় বারবার উঠে এসেছে, বিপদে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাঁর অভ্যাস। পরিচিত বা অপরিচিত—কারও কষ্ট দেখলে তিনি সহজে নিজেকে দূরে রাখতে পারতেন না।

অনেক সময় নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়েও তিনি সাহায্য করতেন। দরিদ্র ছাত্রদের জন্য অর্থ দিয়েছেন, অসহায় মানুষকে আশ্রয় দিয়েছেন, অভাবী পরিবারকে সহায়তা করেছেন।

এই কারণেই তাঁর নামের সঙ্গে “দয়ার সাগর” উপাধিও যুক্ত হয়েছিল।

তবে তাঁর দয়া কখনও দুর্বলতা ছিল না। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেমন কঠোর ছিলেন, মানুষের কষ্টের সামনে তেমনই কোমল।

একদিকে তিনি সমাজের রক্ষণশীল শক্তির সঙ্গে তর্ক করেছেন, অন্যদিকে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

এই দুই বিদ্যাসাগরকে আলাদা করা যায় না।

যে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে, তার হৃদয়ে মানুষের জন্য গভীর ভালোবাসা না থাকলে সেই লড়াই দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

কার্মাটারের নির্জনতা: যে ক্ষত স্বীকৃতি সারাতে পারেনি

জীবনের শেষ পর্বে কলকাতার কোলাহল থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন বিদ্যাসাগর। ঝাড়খণ্ডের কার্মাটারে তিনি খুঁজে নিয়েছিলেন এক অন্য ধরনের জীবন।

কলকাতার শিক্ষিত সমাজ, যাদের জন্য তিনি এত কিছু করেছিলেন, তাদের একাংশের আচরণে তিনি অনেক সময় হতাশ হয়েছিলেন। যে সমাজের পরিবর্তনের জন্য তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, সেই সমাজের সংকীর্ণতা তাঁকে আঘাত করেছিল।

কার্মাটারে তিনি সাঁওতাল মানুষের কাছাকাছি এসেছিলেন। তাঁদের জীবন, সরলতা এবং মানবিক সম্পর্ক তাঁকে আকর্ষণ করেছিল।

সেখানে তিনি শুধু একজন সমাজ সংস্কারক ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন মানুষ, যিনি মানুষের মধ্যে মানুষ খুঁজতেন।

সাঁওতালদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দেখায়, তাঁর মানবিকতা কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা পরিচয়ের মধ্যে আটকে ছিল না। কলকাতার সভা, বিতর্ক আর সামাজিক সংঘর্ষ থেকে দূরে, কার্মাটারের নির্জনতায় তিনি যেন নিজের সঙ্গে আরেকবার দেখা করেছিলেন।

খ্যাতি সব ক্ষত সারাতে পারে না।

কখনও কখনও একজন মানুষকে সবচেয়ে বেশি বুঝতে হয় তাঁর নীরবতার সময়ে।

বিদ্যাসাগর জন্মবার্ষিকীতে আমাদের প্রশ্ন: লড়াই কি শেষ হয়েছে?

প্রতি বছর বিদ্যাসাগর জন্মবার্ষিকী আমাদের মনে করিয়ে দেয় একজন মানুষের সংগ্রামের কথা। কিন্তু শুধু স্মরণ করলেই কি তাঁর আদর্শকে সম্মান করা হয়?

বিদ্যাসাগর যে সমস্যাগুলোর বিরুদ্ধে লড়েছিলেন, তার সবকিছু কি আজ শেষ হয়ে গেছে?

ভারতে বাল্যবিবাহ আইনত নিষিদ্ধ হলেও বিভিন্ন সরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে দেখা যায়, এখনও কিছু অঞ্চলে অল্প বয়সে বিয়ের ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ আইন পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু সামাজিক সচেতনতার কাজ এখনও বাকি।

কুসংস্কারও অন্য রূপে টিকে আছে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও ভুল তথ্য, অন্ধ বিশ্বাস এবং যুক্তিহীন ভয় মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

এখানেই বিদ্যাসাগরের প্রাসঙ্গিকতা।

তাঁকে স্মরণ করার অর্থ শুধু তাঁর মূর্তিতে মালা দেওয়া নয়। তাঁর মতো করে প্রশ্ন করতে শেখা। যেখানে অন্যায় দেখব, সেখানে নিজের সুবিধার জন্য চুপ না থাকা।

একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য আমাদের ভাবায়। আমরা বিদ্যাসাগরের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করি, কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষা—যুক্তি, মানবিকতা ও সাহস—কতটা নিজের জীবনে গ্রহণ করি?

তিনি চেয়েছিলেন এমন একটি সমাজ, যেখানে জন্ম, লিঙ্গ বা প্রথা মানুষের সম্ভাবনার পথ আটকে দেবে না।

সেই সমাজ তৈরির কাজ এখনও শেষ হয়নি।

সাগর থামে না

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনকে শুধু কয়েকটি সংস্কার আন্দোলন, কয়েকটি বই বা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস দিয়ে বোঝা যায় না।

তিনি ছিলেন এক চলমান প্রশ্ন।

যখন সমাজ বলেছিল, “এভাবেই চলে আসছে”, তখন তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন—“কিন্তু এটি কি ন্যায়সঙ্গত?”

যখন মানুষ বলেছিল, “এটি অসম্ভব”, তখন তিনি দেখিয়েছিলেন—মানবিক ইচ্ছাশক্তি অসম্ভবের সীমানা বদলে দিতে পারে।

বীরসিংহের সেই দরিদ্র ঘর থেকে শুরু হওয়া যাত্রা শেষ পর্যন্ত মানুষের বিবেকের দরজায় এসে পৌঁছেছিল। তাঁর হাতে ছিল বই, কিন্তু সেই বইয়ের ভেতর ছিল মুক্তির স্বপ্ন।

আজ বিদ্যাসাগর জন্মবার্ষিকী শুধু অতীতের একজন মানুষকে মনে করার দিন নয়। এটি নিজের ভেতরের অন্ধকারকে প্রশ্ন করার দিন।

কারণ সত্যিকারের সাগর কখনও থেমে থাকে না। তার জল বারবার ফিরে আসে, ধুয়ে দেয় জমে থাকা কুসংস্কার, ভয় আর অন্যায়ের ময়লা।

আর সেই সাগরের নাম—ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

সর্বশেষ