ফেসবুক আপনার সম্পর্কে কী জানে: ডেটা ডাউনলোড করে দেখার পদ্ধতি

সর্বাধিক আলোচিত

ফেসবুক অনেক দিন ধরে ব্যবহার করলে একসময় কৌতূহল জাগতেই পারে—এত বছরের কী কী তথ্য আসলে অ্যাকাউন্টের সঙ্গে জমে আছে?

পুরোনো পোস্ট বা ছবি তো আছেই। এর সঙ্গে থাকতে পারে সার্চের ইতিহাস, বিভিন্ন পোস্টে প্রতিক্রিয়া, লগইনের তথ্য, অনুসরণ করা পেজ বা গ্রুপ, ফেসবুক লগইন দিয়ে যুক্ত করা অ্যাপ এবং আরও কিছু কার্যকলাপ। এসবের অন্তত একটি বড় অংশ নিজের অ্যাকাউন্ট থেকেই দেখা ও ডাউনলোড করা যায়।

ফেসবুক ডেটা ডাউনলোড মূলত সেই কাজের জন্য। তবে ডাউনলোড করা ফাইলকে মেটা আপনার সম্পর্কে যা কিছু জানে তার পূর্ণ নথি ভাবা ঠিক হবে না। এটি ব্যবহারকারীর জন্য উন্মুক্ত তথ্যের একটি কপি।

ফেসবুকে কী ধরনের তথ্য পাওয়া যেতে পারে

সবার ক্ষেত্রে একই জিনিস দেখা যাবে না। ফেসবুক কীভাবে ব্যবহার করেছেন, সেটাই এখানে বড় বিষয়।

নিয়মিত পোস্ট করলে পোস্ট, মন্তব্য, ছবি, ভিডিও, রিলস, স্টোরিজ ও বিভিন্ন প্রতিক্রিয়ার তথ্য থাকবে। অ্যাক্টিভিটি লগ-এ অনেক পুরোনো কাজও পাওয়া যায়—যেমন সার্চ, লাইক, মন্তব্য বা আগে ব্যবহার করা কোনো সুবিধা।

বন্ধু, অনুসরণ করা পেজ, গ্রুপ এবং ফেসবুকের ভেতরে তৈরি হওয়া বিভিন্ন সংযোগের তথ্যও থাকতে পারে। আরও কিছু তথ্য সরাসরি চোখে পড়ে না। যেমন ব্যবহৃত যন্ত্র, ব্রাউজার, নেটওয়ার্ক, আইপি ঠিকানা বা অবস্থান-সংক্রান্ত কিছু তথ্য।

ফোনে ফেসবুকের জন্য অবস্থান শনাক্তকরণ বন্ধ থাকলে সুনির্দিষ্ট অবস্থান পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়। কিন্তু আইপি ঠিকানা বা নেটওয়ার্কের তথ্য তখনও থাকতে পারে। তাই অবস্থান শনাক্তকরণ বন্ধ মানেই অবস্থান-সংক্রান্ত সব তথ্য বন্ধ—এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

ফেসবুকের বাইরের কার্যকলাপও থাকতে পারে

ফেসবুকের বাইরের কার্যকলাপও থাকতে পারে

এই অংশটি অনেক ব্যবহারকারী আগে খেয়ালই করেন না। কোনো ওয়েবসাইট বা অ্যাপ মেটা পিক্সেল, ফেসবুক লগইন, এপিআই, এসডিকে বা মেটার অন্য ব্যবসায়িক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে সেখানকার কিছু কার্যকলাপের তথ্য মেটার কাছে যেতে পারে।

ধরুন, ফেসবুক লগইন দিয়ে কোনো অ্যাপে ঢুকেছেন, অথবা এমন কোনো ওয়েবসাইট ব্যবহার করেছেন যেখানে মেটার ব্যবসায়িক টুল বসানো আছে। সেই ব্যবহারের কিছু তথ্য আপনার মেটা অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

এ ধরনের তথ্য দেখার জন্য মেটা প্রযুক্তির বাইরে আপনার কার্যকলাপ নামে একটি অংশ রয়েছে।

সেখানে কোনো ব্যবসা বা ওয়েবসাইটের নাম দেখলেই ধরে নেওয়ার কারণ নেই যে তারা আপনার ফেসবুক পাসওয়ার্ড বা ব্যক্তিগত প্রোফাইল পেয়েছে। সাধারণত বিষয়টি হয় কার্যকলাপের তথ্য আদান-প্রদান নিয়ে।

নিজের ফেসবুক তথ্য কোথায় পাবেন

ফেসবুকের আপনার তথ্য দেখুন অংশে তথ্যগুলো বিভিন্ন ভাগে সাজানো থাকে। সেখানে সাধারণত ফেসবুকে আপনার কাজ, ব্যক্তিগত তথ্য, সংযোগ, লগইন ও নিরাপত্তা, বিজ্ঞাপন এবং ফেসবুকের বাইরের অ্যাপ বা ওয়েবসাইট সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া যায়।

সবকিছু একসঙ্গে নামাতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই।

শুধু নিজের অ্যাকাউন্টে কী জমে আছে দেখতে চাইলে প্রথমে কয়েকটি নির্দিষ্ট বিভাগ বেছে নেওয়াই সহজ। বহু বছরের ছবি ও ভিডিও একসঙ্গে নিলে ফাইল অনেক বড় হতে পারে।

অ্যাকাউন্ট মুছে দেওয়ার কথা ভাবলে অবশ্য প্রয়োজনীয় ছবি, পোস্ট বা অন্য তথ্য আগে সংরক্ষণ করে নেওয়া ভালো।

ফেসবুক ডেটা ডাউনলোড করার পদ্ধতি

মেটার মেনু এখন সবার অ্যাকাউন্টে এক রকম নাও দেখা যেতে পারে। চলমান পরিবর্তনের কারণে কোথাও অ্যাকাউন্টস সেন্টার, কোথাও মেটা অ্যাকাউন্ট দেখা যাচ্ছে। একইভাবে আপনার তথ্য ডাউনলোড করুন বা আপনার তথ্য রপ্তানি করুন—দুটোর যেকোনো একটি নাম থাকতে পারে।

তাই স্ক্রিনে হুবহু একই লেখা না পেলেও কাছাকাছি অপশন দেখুন।

মোবাইলে সাধারণত এই পথ ধরে যেতে হবে:

ফেসবুক অ্যাপ → মেনু → সেটিংস ও গোপনীয়তা → সেটিংস

এরপর অ্যাকাউন্টস সেন্টার বা মেটা অ্যাকাউন্ট খুলুন।

সেখানে আপনার তথ্য ও অনুমতি অংশে যান। এরপর আপনার তথ্য ডাউনলোড করুন বা আপনার তথ্য রপ্তানি করুন খুঁজুন।

একাধিক ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল যুক্ত থাকলে কোন প্রোফাইলের তথ্য নিচ্ছেন, সেটি দেখে নিন।

এরপর ঠিক করতে পারবেন সব তথ্য নেবেন, নাকি নির্দিষ্ট কয়েকটি বিভাগ। সময়সীমাও বেছে নেওয়া যায়। শুধু সাম্প্রতিক তথ্য দরকার হলে পুরো অ্যাকাউন্টের ইতিহাস নামানোর প্রয়োজন নেই।

সব ঠিক হলে ফাইল তৈরির অনুরোধ দিন। ফাইল তৈরি হতে কিছু সময় লাগতে পারে। প্রস্তুত হলে ফেসবুক থেকে সেটি ডাউনলোড করা যাবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অ্যাকাউন্ট যাচাই করতে বলা হতে পারে।

কম্পিউটারেও প্রায় একই জায়গায় অপশনটি পাওয়া যায়:

সেটিংস → অ্যাকাউন্টস সেন্টার বা মেটা অ্যাকাউন্ট → আপনার তথ্য ও অনুমতি → আপনার তথ্য ডাউনলোড বা রপ্তানি করুন

অনেক ছবি-ভিডিও থাকলে কম্পিউটারেই ফাইল দেখা বেশি আরামদায়ক।

এইচটিএমএল না জেসন?

এখানে বেশি ভাবার দরকার নেই।

শুধু নিজের তথ্য খুলে পড়তে চাইলে এইচটিএমএল নিন। ব্রাউজারে সহজে দেখা যায়।

জেসন মূলত কাঠামোবদ্ধ তথ্য। প্রোগ্রামিং, তথ্য বিশ্লেষণ বা কোনো সফটওয়্যারে এগুলো নিয়ে কাজ করার প্রয়োজন হলে সেটি কাজে লাগে।

সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য এইচটিএমএলই বেশির ভাগ সময় যথেষ্ট।

ডাউনলোড করার পর কী দেখবেন

ফাইল খুলে প্রথমেই সবকিছু ঘাঁটতে গেলে বিরক্ত লাগতে পারে। দীর্ঘদিনের অ্যাকাউন্ট হলে তথ্যের পরিমাণ কম হয় না। শুরু করুন লগইনের তথ্য দিয়ে।

অচেনা কোনো যন্ত্র বা লগইন সেশন দেখা গেলে সেটি যাচাই করুন। তবে লগইনের পাশে দেখানো শহর বা জায়গাকে একেবারে সুনির্দিষ্ট জিপিএস অবস্থান ধরে নেবেন না। নেটওয়ার্ক বা আইপি ঠিকানার কারণে অবস্থান কিছুটা ভিন্ন দেখাতে পারে।

লগইনটি নিজের নয় মনে হলে পাসওয়ার্ড বদলান, সক্রিয় লগইনগুলো দেখুন এবং দুই ধাপের পরিচয় যাচাই চালু আছে কি না পরীক্ষা করুন।

এরপর পুরোনো অ্যাপের সংযোগ দেখুন।

ফেসবুক লগইন দিয়ে বহু বছর আগে কোনো অ্যাপে ঢুকেছিলেন, কিন্তু এখন আর ব্যবহার করেন না—এমন সংযোগ পড়ে থাকা অস্বাভাবিক নয়। অ্যাপ ও ওয়েবসাইট অংশে এগুলো দেখা যায়।

ব্যবহার না করা সংযোগ সরিয়ে দিলে অন্তত অ্যাকাউন্ট পরিষ্কার থাকে।

আরও পড়ুন: গুগল অ্যাকাউন্টের প্রাইভেসি চেকআপ: কোন সেটিংস আগে বদলাবেন

বিজ্ঞাপন ও ফেসবুকের বাইরের তথ্যও একবার দেখুন

বিজ্ঞাপন পছন্দ অংশে গিয়ে বিজ্ঞাপন-সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণগুলো দেখা যায়। আর মেটা প্রযুক্তির বাইরে আপনার কার্যকলাপ অংশে ফেসবুকের বাইরের কোন কোন সেবা থেকে কার্যকলাপের তথ্য এসেছে, তা দেখা যেতে পারে।

এই দুই জায়গায় এমন কিছু নাম চোখে পড়তে পারে, যা মনে নেই। সেটি দেখেই ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। আগে দেখুন তথ্যটি কী ধরনের এবং ফেসবুক সেখানে কী নিয়ন্ত্রণ দিচ্ছে।

পুরোনো কার্যকলাপ মুছে ফেলা আর ভবিষ্যতে এই ধরনের তথ্য কীভাবে ব্যবহৃত হবে, তা নিয়ন্ত্রণ করা এক বিষয় নয়। অপশন বদলানোর আগে লেখাটি পড়ে নেওয়াই ভালো।

গোপনীয়তা যাচাইও দেখে নিন

গোপনীয়তা যাচাইও দেখে নিন

ফেসবুকের তথ্য ডাউনলোড করার আসল কাজ শুধু জিপ ফাইল রেখে দেওয়া নয়। ডাউনলোড করা তথ্য দেখে মনে হলে কিছু পুরোনো সেটিংও ঠিক করে নেওয়া যায়। গোপনীয়তা যাচাই অংশে কারা আপনার পোস্ট বা প্রোফাইলের তথ্য দেখতে পারে, সেটি দেখা যায়।

দর্শক ও দৃশ্যমানতা অংশে গিয়ে পুরোনো পোস্ট, অনুসরণকারী, ট্যাগিং, স্টোরিজ বা কে আপনাকে খুঁজে পাবে—এসবও দেখে নিতে পারেন।

বিশেষ করে অনেক বছর আগে খোলা অ্যাকাউন্টে পুরোনো শেয়ারিং সেটিংস আজকের পছন্দের সঙ্গে না-ও মিলতে পারে।

ফাইলটি যেখানে-সেখানে রেখে দেবেন না

নিজের ফেসবুক তথ্য ডাউনলোড করার পর সেই ফাইলের ভেতরেই আবার অনেক ব্যক্তিগত তথ্য জমা থাকে। অফিসের ভাগাভাগি করে ব্যবহার করা কম্পিউটার বা অন্যের ব্যবহৃত যন্ত্রে রেখে দেওয়া ঠিক নয়। ক্লাউডে রাখলে কারা দেখতে পারে, সেটি দেখে নিন।

অচেনা কোনো “ফেসবুক ডেটা ভিউয়ার” ওয়েবসাইটে পুরো ফাইল আপলোড করাও ভালো ধারণা নয়।

আর ফেসবুক পাসওয়ার্ড বা লগইনের যাচাইকরণ কোড কোনো তৃতীয় পক্ষের সেবাকে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

একবার দেখে নেওয়াই যথেষ্ট শুরু

ফেসবুক ডেটা ডাউনলোড করার পর প্রথম দিনেই সব ফাইল পড়ার দরকার নেই। লগইন ঠিক আছে কি না দেখুন। পুরোনো অ্যাপের সংযোগ আছে কি না দেখুন। তারপর আপনার বর্তমান গোপনীয়তা সেটিংস আগের মতোই রাখতে চান কি না ভাবুন।

এই তিনটি জায়গা দেখলেই অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে অনেক পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।

ফেসবুক আপনার সম্পর্কে কী রেখেছে, তা নিয়ে অনুমান করার চেয়ে নিজের তথ্য একবার খুলে দেখা বেশি কাজে দেয়। সেই অর্থে ফেসবুক ডেটা ডাউনলোড কোনো জটিল প্রযুক্তিগত কাজ নয়; নিজের পুরোনো ফেসবুক ব্যবহারের হিসাব একবার মিলিয়ে দেখার সহজ উপায়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

ফেসবুক থেকে নিজের তথ্য ডাউনলোড করতে কি টাকা লাগে?

না। Facebook থেকে নিজের অ্যাকাউন্টের উপলভ্য তথ্য ডাউনলোড বা রপ্তানি করার জন্য আলাদা কোনো ফি দিতে হয় না।

ফেসবুকের সব তথ্য কি একবারে ডাউনলোড করতে হবে?

না। প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট ধরনের তথ্য বা নির্দিষ্ট সময়সীমা বেছে নেওয়া যায়। শুধু নিজের কার্যকলাপ, লগইন বা বিজ্ঞাপন-সংক্রান্ত তথ্য দেখতে চাইলে সব ছবি-ভিডিও নামানোর প্রয়োজন নেই।

ফেসবুকের তথ্য ডাউনলোড করলে কি অ্যাকাউন্ট মুছে যাবে?

না। তথ্য ডাউনলোড করা এবং অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলা আলাদা বিষয়। তথ্যের কপি নেওয়ার পরও Facebook অ্যাকাউন্ট স্বাভাবিকভাবেই ব্যবহার করা যাবে।

ডাউনলোড করা Facebook ফাইল কোথায় রাখা নিরাপদ?

নিজের ব্যক্তিগত কম্পিউটার বা নিরাপদ ক্লাউড সংরক্ষণস্থলে রাখা ভালো। অন্যদের ব্যবহৃত কম্পিউটার, উন্মুক্ত ফোল্ডার বা অচেনা তৃতীয় পক্ষের ওয়েবসাইটে পুরো ফাইল রাখা বা আপলোড করা এড়িয়ে চলুন।

Facebook-এর বাইরের কোনো ওয়েবসাইটের নাম দেখলে কি সেটি আমার পাসওয়ার্ড পেয়েছে?

না, শুধু কোনো ওয়েবসাইট বা প্রতিষ্ঠানের নাম দেখা থেকে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। এর অর্থ হতে পারে ওই সেবা Meta-র কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করে কিছু কার্যকলাপের তথ্য পাঠিয়েছে।

সর্বশেষ