ইতিহাস কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় লেখা কিছু তারিখের সমষ্টি নয়; এটি মানুষের বিজয়, ট্র্যাজেডি এবং রূপান্তরের এক চলমান উপাখ্যান। আপনি যদি ২৬শে সেপ্টেম্বরের পাতাগুলো উল্টে দেখেন, তবে এমন একটি দিন আবিষ্কার করবেন যা আমাদের আধুনিক বিশ্বকে গভীরভাবে রূপ দিয়েছে। রাশিয়ার একটি শান্ত বাঙ্কার থেকে শুরু করে, যেখানে একজন মানুষ পারমাণবিক বিপর্যয় থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করেছিলেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চ পর্যন্ত, যেখানে প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষার ধ্বনি সগৌরবে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল—এই তারিখটি সময়ের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে, আর কখনো বা বিষাদে খোদাই করা আছে।
আপনি ইতিহাসের ছাত্র হন, সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানী হন, অথবা পৃথিবী সম্পর্কে কৌতূহলী সাধারণ মানুষই হোন না কেন, ২৬শে সেপ্টেম্বর কী ঘটেছিল তা অন্বেষণ করা মানবজাতির অগ্রগতি এবং টিকে থাকার এক বিস্তীর্ণ চিত্র তুলে ধরে। রাজনৈতিক মোড়, স্বপ্নদ্রষ্টাদের জন্ম, কিংবদন্তিদের বিদায় এবং আমাদের অতীতের সাথে সংযুক্ত চমকপ্রদ তথ্যগুলোকে আমরা অত্যন্ত যত্ন সহকারে এই দিনটির ঘটনাপঞ্জিতে তুলে ধরেছি। আসুন, সময়ের মধ্য দিয়ে এক রোমাঞ্চকর যাত্রা করি এবং ২৬শে সেপ্টেম্বরের গভীরতা উন্মোচন করি।
বাঙ্গালি পরিমণ্ডল: নবজাগরণ, প্রতিরোধ এবং পুনর্জন্ম
ভারতীয় উপমহাদেশ, বিশেষ করে সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র বাংলা, ২৬শে সেপ্টেম্বর এক গভীর ঐতিহাসিক পালাবদলের সাক্ষী হয়েছে। এই দিনে এই অঞ্চলের ইতিহাসে যেমন রয়েছে ভাষাগত গর্বের চরম শিখর, তেমনি আছে সাংবিধানিক সংকটের গভীর বেদনা এবং সর্বশ্রেষ্ঠ কয়েকজন প্রতিভার জন্মের আনন্দ।
রাজনৈতিক মাইলফলক
১৯৭৪: জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলা ভাষা
১৯৭৪ সালের এই ঐতিহাসিক দিনে, বাংলাদেশের স্থপতি ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ বাংলায় তাঁর অবিস্মরণীয় ভাষণ প্রদান করেন। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রক্তস্নাত একটি জাতির জন্য এটি ছিল এক বিশাল ও চূড়ান্ত বিজয়। বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে মাতৃভাষায় কথা বলার মাধ্যমে তিনি কোটি কোটি মানুষের মুখের ভাষা বাংলাকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দেন এবং বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দেন যে, একটি জাতির পরিচয় তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত ঐতিহ্যের সাথে কতটা অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।
১৯৭৫: ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের কালো ছায়া
অন্যদিকে, ঠিক এক বছর পর বাংলাদেশে ২৬শে সেপ্টেম্বর একটি অত্যন্ত মর্মান্তিক আইনি নজিরের দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়। আগস্ট মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর, খন্দকার মোশতাক আহমেদ কুখ্যাত ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ বা দায়মুক্তি অধ্যাদেশ জারি করেন। এই অমানবিক আইনটি খুনিদের বিচারের হাত থেকে রক্ষা করে, আইনের শাসনকে ভূলুণ্ঠিত করে এবং জাতিকে ন্যায়বিচারের জন্য এক দীর্ঘ কয়েক দশকের অন্ধকার পথে ঠেলে দেয়, যার সমাধান পেতে জাতিকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
বিখ্যাত জন্ম
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (জন্ম: ১৮২০)

বাংলার নবজাগরণে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চেয়ে বড় কোনো ব্যক্তিত্বের কথা কল্পনা করাও কঠিন। এই দিনে মেদিনীপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করা এই মহানুভব মানুষটি ছিলেন একাধারে বহুভাষাবিদ, শিক্ষাবিদ এবং এক আপসহীন সমাজ সংস্কারক। তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি ‘বর্ণপরিচয়’-এর মাধ্যমে তিনি বাংলা বর্ণমালাকে সহজ ও আধুনিক করেছেন, যা আজও প্রাথমিক শিক্ষার অন্যতম মূল ভিত্তি। এর চেয়েও বড় কথা, বিদ্যাসাগর নারী অধিকারের পক্ষে এক অবিচল কণ্ঠস্বর ছিলেন। সমাজের তীব্র বাধা ও কটূক্তি উপেক্ষা করে তিনি ১৮৫৬ সালের হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন প্রণয়নে সফলভাবে প্রচারণা চালান, যা ঔপনিবেশিক ভারতের সামাজিক কাঠামোকে আমূল বদলে দিয়েছিল।
দেব আনন্দ (জন্ম: ১৯২৩)
ব্রিটিশ ভারতের গুরদাসপুরে ধরম দেবদত্ত পিশোরিমাল আনন্দ হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন তিনি, যিনি পরবর্তীতে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ‘চিরসবুজ তারকা’ দেব আনন্দ নামে পরিচিতি পান। বোম্বে নোয়ার (Bombay Noir)-এর অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে, তাঁর দ্রুতলয়ে কথা বলার ধরন, মাথা নাড়ানোর স্টাইল এবং অসীম মোহনীয়তা একটি পুরো যুগকে সংজ্ঞায়িত করেছিল। নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান নবকেতন ফিল্মসের মাধ্যমে তিনি ‘গাইড’ এবং ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’-এর মতো কালজয়ী চলচ্চিত্র পরিচালনা, প্রযোজনা ও অভিনয় করেছেন, যা বলিউডের ইতিহাসে এক অমলিন ছাপ রেখে গেছে।
ড. মনমোহন সিং (জন্ম: ১৯৩২)
পাঞ্জাবের গাহ-তে (বর্তমানে পাকিস্তানে) জন্মগ্রহণ করা ড. মনমোহন সিং আধুনিক ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হন। অক্সফোর্ড থেকে শিক্ষিত এই প্রতিভাবান অর্থনীতিবিদ ১৯৯১ সালে ভারতের অর্থনৈতিক উদারীকরণের মূল স্থপতি হিসেবে কাজ করেন, যা দেশটিকে চরম আর্থিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্ত থেকে টেনে তুলেছিল। পরবর্তীতে তিনি ২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ভারতের ১৩শ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তিনিই প্রথম শিখ হিসেবে এই পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
বিখ্যাত মৃত্যু
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় (মৃত্যু: ১৯৮৯)
পুরো ভারতে হেমন্ত কুমার নামে সমধিক পরিচিত এই কিংবদন্তি সংগীত পরিচালক এবং প্লেব্যাক গায়কের কণ্ঠস্বর একই সাথে বাংলার আত্মা এবং বলিউডের হৃদয় জয় করেছিল। রবীন্দ্রসংগীত এবং রোমান্টিক মেলোডির এই জাদুকরের প্রয়াণ উপমহাদেশের সংগীত জগতে এমন এক শূন্যতা তৈরি করেছিল যা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। তবে তাঁর চিরঞ্জীব গানগুলো আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে সমানভাবে উদযাপিত হয়।
আন্তর্জাতিক দিবস ও ছুটি

বিশ্বব্যাপী ২৬শে সেপ্টেম্বর বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক ও বৈশ্বিক শান্তি উদ্যোগের জন্য নিবেদিত।
| দিবস / ছুটি | মূল লক্ষ্য / তাৎপর্য |
| পারমাণবিক অস্ত্র সম্পূর্ণ নির্মূলের আন্তর্জাতিক দিবস | পারমাণবিক অস্ত্রের অস্তিত্বগত হুমকি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে এবং বৈশ্বিক নিরস্ত্রীকরণের দিকে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে ত্বরান্বিত করতে জাতিসংঘ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। |
| বিশ্ব জন্মনিয়ন্ত্রণ দিবস | ২০০৭ সালে চালু হওয়া এই প্রচারণার উদ্দেশ্য হলো জন্মনিয়ন্ত্রণ বিকল্পগুলো সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, যাতে প্রতিটি গর্ভাবস্থাই কাঙ্ক্ষিত হয় এবং যৌন স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকে। |
| বিশ্ব পরিবেশগত স্বাস্থ্য দিবস | আমাদের গ্রহের ইকোসিস্টেমের স্বাস্থ্য এবং মানুষের সার্বিক কল্যাণের মধ্যে যে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে, তা তুলে ধরতে ২০১১ সালে এই দিবসটির সূচনা হয়। |
| ইউরোপীয় ভাষা দিবস | ভাষা শিক্ষাকে উৎসাহিত করতে এবং মহাদেশের ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষার্থে কাউন্সিল অফ ইউরোপ জুড়ে দিনটি উদযাপিত হয়। |
| বিপ্লব দিবস (ইয়েমেন) | ১৯৬২ সালের ঐতিহাসিক বিপ্লবকে স্মরণ করে একটি জাতীয় ছুটি, যা মুতাওয়াক্কিলাইট রাজ্যকে উৎখাত করে ইয়েমেন আরব প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। |
বিশ্ব ইতিহাস
২৬শে সেপ্টেম্বরের প্রকৃত গুরুত্ব অনুধাবন করতে হলে আমাদের মহাদেশগুলোর সীমানা পেরিয়ে তাকাতে হবে। এই দিনে সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে, আধুনিক গণমাধ্যম রাজনীতিকে পাল্টে দিয়েছে, এবং মানবজাতি একটুর জন্য আত্মধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: টিভিপর্দায় রাজনীতিকের আত্মপ্রকাশ (১৯৬০)
মার্কিন রাজনীতির দৃশ্যপট চিরতরে বদলে যায়, যখন জন এফ. কেনেডি এবং রিচার্ড এম. নিক্সন প্রথমবারের মতো সরাসরি সম্প্রচারিত টেলিভিশন প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কে মুখোমুখি হন। প্রায় সাত কোটি আমেরিকান এই বিতর্ক দেখেছিলেন। নিক্সন তখনো একটি অসুস্থতা থেকে সেরে উঠছিলেন, তিনি মঞ্চের মেকআপ নিতে অস্বীকার করেন এবং তাঁকে ফ্যাকাশে ও ঘর্মাক্ত দেখাচ্ছিল। অন্যদিকে কেনেডিকে লাগছিল সতেজ, আত্মবিশ্বাসী এবং আকর্ষণীয়। মজার ব্যাপার হলো, যারা রেডিওতে বিতর্ক শুনেছিলেন তাদের মতে যুক্তিতে নিক্সন জয়ী হয়েছিলেন; কিন্তু টেলিভিশন দর্শকরা বিপুলভাবে কেনেডিকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। এটি প্রমাণ করে যে রাজনীতিতে নীতির মতোই মানুষের চোখের দেখাও কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: শেইস বিদ্রোহ (১৭৮৬)
ম্যাসাচুসেটসে শেইস বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল যখন ঋণের বোঝায় জর্জরিত ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত সশস্ত্র কৃষকরা স্থানীয় আদালতগুলো বন্ধ করে দিয়ে প্রতিবাদ শুরু করে। যদিও শেষ পর্যন্ত এই বিদ্রোহ দমন করা হয়েছিল, তবে এটি রাজনীতিবিদদের মনে শঙ্কা তৈরি করেছিল এবং সাংবিধানিক কনভেনশনের একটি প্রধান অনুঘটক হয়ে উঠেছিল, যার ফলে একটি শক্তিশালী ফেডারেল সরকার গঠিত হয়।
রাশিয়া / সোভিয়েত ইউনিয়ন: যে মানুষটি পৃথিবীকে বাঁচিয়েছিলেন (১৯৮৩)
স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনা যখন চরমে, তখন মস্কোর কাছে একটি গোপন বাঙ্কারে সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে। সোভিয়েত আর্লি-ওয়ার্নিং সিস্টেম ‘ওকো’ রিপোর্ট করে যে পাঁচটি আমেরিকান মিনিটম্যান ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। ডিউটি অফিসার স্তানিস্লাভ পেত্রভের হাতে মাত্র কয়েক মিনিট সময় ছিল এই উৎক্ষেপণের খবর তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানোর জন্য, যার অর্থ ছিল নিশ্চিতভাবে একটি পারমাণবিক পাল্টা হামলা শুরু হওয়া। নিজের অন্তর্দৃষ্টি এবং যুক্তির ওপর আস্থা রেখে পেত্রভ ভাবলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই প্রথম হামলা চালায় তবে তারা শত শত মিসাইল ছুড়বে, মাত্র পাঁচটি নয়। তিনি এটিকে ফলস অ্যালার্ম বা মিথ্যা সংকেত হিসেবে ঘোষণা করেন। তাঁর ধারণাই ঠিক ছিল—এটি ছিল বেশি উচ্চতার মেঘে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হওয়ার কারণে সৃষ্ট একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি। তাঁর এই শান্ত সিদ্ধান্তটি আক্ষরিক অর্থেই বিশ্বকে পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা করেছিল।
যুক্তরাজ্য: বিশ্ব প্রদক্ষিণ (১৫৮০)
ইংরেজ প্রাইভেটিয়ার স্যার ফ্রান্সিস ড্রেক তাঁর ‘গোল্ডেন হাইন্ড’ জাহাজ নিয়ে প্লাইমাউথ বন্দরে প্রবেশ করেন এবং সফলভাবে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্ব প্রদক্ষিণ সম্পন্ন করেন। লুট করা স্প্যানিশ ধনসম্পদ এবং বিরল মসলায় বোঝাই ড্রেকের এই সমুদ্রযাত্রা রানী প্রথম এলিজাবেথের জন্য আর্থিকভাবে ব্যাপক সফল ছিল। এটি ইংল্যান্ডকে একটি প্রধান নৌ পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং ভবিষ্যতের ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণের পথ প্রশস্ত করে।
কানাডা: থিয়েপভাল রিজের যুদ্ধ (১৯১৬)
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নৃশংস ও কর্দমাক্ত ভয়াবহতার মধ্যে, কানাডিয়ান কর্পস ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টে তাদের সক্ষমতার প্রমাণ দেয়। ২৬শে সেপ্টেম্বর, কানাডিয়ান এবং ব্রিটিশ সৈন্যরা বৃহত্তর ‘ব্যাটল অব দ্য সোম’-এর সময় থিয়েপভাল রিজ দখলের জন্য একটি বড় আক্রমণ শুরু করে। জার্মানদের বিধ্বংসী মেশিনগানের গুলি এবং বিপজ্জনক “নো ম্যানস ল্যান্ড” পার হয়ে কানাডিয়ানরা সাহসিকতার সাথে প্রথম দুটি ট্রেঞ্চ লাইন দখল করে নেয়। এটি বিশ্বমঞ্চে কানাডার সামরিক পরিপক্বতার একটি সংজ্ঞায়িত মুহূর্ত ছিল।
অস্ট্রেলিয়া: খেলাধুলার দীর্ঘতম জয়ের ধারার সমাপ্তি (১৯৮৩)
রোড আইল্যান্ডের নিউপোর্টের জলরাশিতে ‘অস্ট্রেলিয়া টু’ নামক ইয়টটি অসম্ভবকে সম্ভব করেছিল। অত্যন্ত গোপনীয় উইংড কিলের সাহায্যে অস্ট্রেলিয়ান জাহাজটি আমেরিকান ডিফেন্ডার ‘লিবার্টি’কে পরাজিত করে। নিউ ইয়র্ক ইয়ট ক্লাব বিস্ময়করভাবে ১৩২ বছর ধরে আমেরিকা’স কাপ নিজেদের দখলে রেখেছিল—যা ছিল আধুনিক ক্রীড়া ইতিহাসের দীর্ঘতম জয়ের ধারা। দেশে ফিরে, আনন্দে উদ্বেলিত অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী বব হক বিখ্যাত এক ঘোষণায় বলেছিলেন, যে বস আজকে উদযাপন করার জন্য ছুটি নেওয়ায় তার কোনো কর্মীকে বরখাস্ত করবে, সে একজন “বখাটে”।
চীন: হংকংয়ের ভবিষ্যৎ (১৯৮৪)
যুক্তরাজ্য এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিনিধিরা বেইজিংয়ে সিনো-ব্রিটিশ যৌথ ঘোষণাপত্রে প্রাথমিক স্বাক্ষর করেন। এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি ১৯৯৭ সালে হংকং হস্তান্তরের ভিত্তি স্থাপন করে। এখানে “এক দেশ, দুই ব্যবস্থা” নীতির রূপরেখা দেওয়া হয়, যা নিশ্চিত করে যে হংকং হস্তান্তরের পর ৫০ বছর ধরে তার পুঁজিবাদী অর্থনীতি এবং গণতান্ত্রিক অধিকার বজায় রাখবে।
ইউরোপ: পার্থেননের ট্র্যাজেডি (১৬৮৭)
অ্যাথেন্সের পার্থেনন, যা দুই সহস্রাব্দেরও বেশি সময় ধরে প্রায় অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল, তার ইতিহাসে সবচেয়ে বিধ্বংসী আঘাতটি পায় এই দিনে। মোরিয়ান যুদ্ধের সময় ভেনিসীয় বাহিনী অ্যাক্রোপলিস অবরোধ করে। উসমানীয় তুর্কিরা প্রাচীন এই মন্দিরের ভেতর বারুদ মজুত করেছিল। একটি ভেনিসীয় মর্টারের গোলা ভবনটিতে আঘাত হানে, যার ফলে ম্যাগাজিনে বিস্ফোরণ ঘটে এবং এই চমৎকার কাঠামোর ছাদ ও চারপাশ টুকরো টুকরো হয়ে উড়ে যায়।
বিশ্বের অন্যান্য স্থান: টাইফুন ভেরা (১৯৫৯)
জাপানে আঘাত হেনেছিল টাইফুন ভেরা। ক্যাটাগরি ৫ হারিকেনের সমতুল্য বাতাসের বেগ নিয়ে এটি ছিল জাপানের রেকর্ডকৃত ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রাণঘাতী টাইফুন। এই বিশাল ঝড়ের জলোচ্ছ্বাস সমুদ্রের দেয়াল গুঁড়িয়ে দেয় এবং উপকূলীয় অঞ্চলগুলো প্লাবিত করে, যার ফলে ৫,০০০ এরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
বিশ্বজুড়ে উল্লেখযোগ্য জন্ম ও মৃত্যু
শিল্পকলা, ক্রীড়া, বিজ্ঞান এবং রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তিত্বের আগমন ও বিদায় দেখেছে ২৬শে সেপ্টেম্বর।
উল্লেখযোগ্য জন্মদিন
| নাম | জন্মের বছর | জাতীয়তা | মূল অবদান ও উত্তরাধিকার |
| ইভান পাভলভ | ১৮৪৯ | রাশিয়ান | ফিজিওলজিস্ট যিনি ক্লাসিক্যাল কন্ডিশনিং (পাভলভিয়ান রেসপন্স) ধারণার প্রবর্তক। ১৯০৪ সালে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী। |
| টি.এস. এলিয়ট | ১৮৮৮ | আমেরিকান-ইংরেজ | ২০শ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান কবি। ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এর রচয়িতা; ১৯৪৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। |
| জর্জ গার্শউইন | ১৮৯৮ | আমেরিকান | কিংবদন্তি সুরকার ও পিয়ানোবাদক, যিনি ‘র্যাপসোডি ইন ব্লু’-এর মতো কাজের মাধ্যমে জ্যাজ এবং ধ্রুপদী সঙ্গীতের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেছিলেন। |
| সেরেনা উইলিয়ামস | ১৯৮১ | আমেরিকান | অসামান্য অ্যাথলেটিক প্রতিভা; ২৩টি গ্র্যান্ড স্ল্যাম নারী সিঙ্গেলস শিরোপা নিয়ে সর্বকালের অন্যতম সেরা টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচিত। |
| মার্টিন হাইডেগার | ১৮৮৯ | জার্মান | প্রভাবশালী এবং বিতর্কিত দার্শনিক, যাঁর অস্তিত্বশীল প্রপঞ্চবিদ্যা (Being and Time) বিষয়ক কাজ ২০শ শতাব্দীর চিন্তাধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। |
| অলিভিয়া নিউটন-জন | ১৯৪৮ | অস্ট্রেলিয়ান | তুমুল জনপ্রিয় গায়িকা এবং অভিনেত্রী, যিনি ‘গ্রিজ’ নামক মিউজিক্যাল চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে সুপারস্টারডম অর্জন করেছিলেন। |
উল্লেখযোগ্য মৃত্যু
| নাম | মৃত্যুর বছর | জাতীয়তা | কারণ / উত্তরাধিকার |
| ড্যানিয়েল বুন | ১৮২০ | আমেরিকান | ফ্রন্টিয়ার্সম্যান এবং অভিযাত্রী, যিনি ওয়াইল্ডারনেস রোড তৈরি এবং কেন্টাকিতে বসতি স্থাপনের জন্য একজন লোকজ নায়কে পরিণত হয়েছিলেন। |
| বেসি স্মিথ | ১৯৩৭ | আমেরিকান | “এমপ্রেস অব দ্য ব্লুজ”, তিনি ছিলেন ১৯২০-এর দশকের সবচেয়ে জনপ্রিয় নারী ব্লুজ গায়িকা। একটি গাড়ি দুর্ঘটনার পর প্রাপ্ত আঘাতের কারণে মারা যান। |
| বেলা বারটোক | ১৯৪৫ | হাঙ্গেরিয়ান | দূরদর্শী সুরকার এবং ইথনোমিউজিকোলজির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, যিনি ধ্রুপদী কাঠামোর সাথে লোকসংগীতের মিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। লিউকেমিয়ায় মারা যান। |
| পল নিউম্যান | ২০০৮ | আমেরিকান | একাডেমি পুরস্কার বিজয়ী অভিনেতা (‘কুল হ্যান্ড লুক’, ‘দ্য হাস্টলার’), রেস কার ড্রাইভার এবং সমাজসেবক যিনি ‘নিউম্যানস ওন’ প্রতিষ্ঠা করেন। ফুসফুসের ক্যান্সারে মারা যান। |
| জ্যাক শিরাক | ২০১৯ | ফরাসি | ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন (১৯৯৫-২০০৭)। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের বিরোধিতা এবং দেশটিকে ইউরো মুদ্রায় স্থানান্তরের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সুপরিচিত। ৮৬ বছর বয়সে শান্তিতে মৃত্যুবরণ করেন। |
আপনি কি জানেন? কিছু চমকপ্রদ তথ্য
-
‘জি-মেন’ (G-Men) এর উৎপত্তি: প্রোহিবিশন যুগে, এফবিআই কুখ্যাত গ্যাংস্টারদের সক্রিয়ভাবে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। ১৯৩৩ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর, এজেন্টরা অবশেষে টেনেসির মেমফিসে জর্জ “মেশিন গান” কেলিকে কোণঠাসা করে ফেলে। কিংবদন্তি আছে যে, ভীতসন্ত্রস্ত কেলি নিজের অস্ত্র ফেলে দিয়ে চিৎকার করে আত্মসমর্পণ করেছিলেন, “গুলি করবেন না, জি-মেন! গুলি করবেন না!” এই ডাকনামটি (যা গভর্নমেন্ট ম্যান-এর সংক্ষিপ্ত রূপ) তৎক্ষণাৎ সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং এফবিআই এজেন্টদের স্থায়ী সাংস্কৃতিক উপাধিতে পরিণত হয়।
-
জাতিসংঘের ইতিহাসের দীর্ঘতম ভাষণ: আপনি যদি মনে করেন আজকের রাজনৈতিক ভাষণগুলো খুব দীর্ঘ হয়, তবে ১৯৬০ সালের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের কথা ভেবে দেখুন। ২৬শে সেপ্টেম্বর, কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রো মঞ্চে ওঠেন এবং একটানা ৪ ঘণ্টা ২৯ মিনিট ধরে বক্তব্য রাখেন—যা জাতিসংঘের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দেওয়া ভাষণ।
-
সিন্ধু সভ্যতার আবিষ্কার: ১৯২৪ সালের এই দিনে, আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া-এর ডিরেক্টর-জেনারেল স্যার জন মার্শাল আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের কাছে মহেঞ্জোদারো এবং হরপ্পা আবিষ্কারের কথা ঘোষণা করেন। এই যুগান্তকারী উদ্ঘাটন ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসকে হাজার হাজার বছর পেছনে নিয়ে যায় এবং প্রমাণ করে যে এখানে এমন এক পরিশীলিত প্রাচীন সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল, যা মিশরীয় ও মেসোপটেমীয় সভ্যতার সমকক্ষ।
শেষ কথা
২৬শে সেপ্টেম্বরের এই ঘটনাবলি মানব ইতিহাসের গতিপথের ওপর এক গভীর উপলব্ধির সুযোগ করে দেয়। বাংলার নবজাগরণের সাংস্কৃতিক উন্মেষ থেকে শুরু করে স্নায়ুযুদ্ধের চরম ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মুহূর্তগুলো প্রমাণ করে যে বিশ্ব কত দ্রুত বদলাতে পারে। আমরা দেখেছি জাতিসংঘে মাতৃভাষার কী প্রবল শক্তি, জাপানে প্রকৃতির অপ্রতিরোধ্য ধ্বংসলীলা, এবং সাহিত্য ও সংগীতে অবিস্মরণীয় প্রতিভাদের জন্মের মাধ্যমে মানব সৃজনশীলতার অপরূপ সৌন্দর্য।
ইতিহাস কেবল ধুলোমাখা পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ কোনো স্থবির বিষয় নয়; এটি এক জীবন্ত, স্পন্দমান ধারাবাহিকতা যা আমাদের বর্তমান বাস্তবতাকে রূপ দেয়। ২৬শে সেপ্টেম্বরের ট্র্যাজেডি, বিজয় এবং নায়কোচিত মুহূর্তগুলোর দিকে ফিরে তাকালে আমরা গভীরভাবে বুঝতে পারি আজ আমরা কে—এবং আগামীকালের পৃথিবীতে আমাদের গন্তব্য ঠিক কোথায় হতে পারে।

