৩১ অক্টোবর মানব ইতিহাসে এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের কাছে এটি ‘হ্যালোউইন’ (Halloween) নামে পরিচিত—যা জীবিত ও মৃতদের জগতের মধ্যকার সীমানা নির্দেশক এক প্রাচীন কেল্টিক ঐতিহ্যের অংশ। তবে আধুনিক যুগের চোখধাঁধানো সাজপোশাক আর উৎসবের আড়ালে এই দিনটি লুকিয়ে রেখেছে ইতিহাসের বেশ কিছু যুগান্তকারী মুহূর্ত, মর্মান্তিক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, চমকপ্রদ সাংস্কৃতিক অর্জন এবং বিশ্ব রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া নানা ঘটনা।
উপনিবেশিক বাংলার উপকূল থেকে শুরু করে—যেখানে মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছিল—জার্মানির উইটেনবার্গের অল সেইন্টস চার্চের দরজা পর্যন্ত, যেখানে মার্টিন লুথার প্রোটেস্ট্যান্ট রিফর্মেশনের আগুন জ্বালিয়েছিলেন, ৩১ অক্টোবর বারবার আমাদের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। নিচে এই দিনটির ঐতিহাসিক ঘটনা, জন্ম-মৃত্যু বার্ষিকী এবং বৈশ্বিক দিবসের এক বিস্তারিত ও মানবিক আখ্যান তুলে ধরা হলো।
| বছর | ঘটনা / মাইলফলক | অঞ্চল / ক্ষেত্র | ঐতিহাসিক তাৎপর্য |
| ১৫১৭ | মার্টিন লুথারের ৯৫ থিসিস প্রকাশ | উইটেনবার্গ, জার্মানি | ইউরোপজুড়ে প্রোটেস্ট্যান্ট রিফর্মেশনের সূচনা। |
| ১৮৬৪ | নেভাডার যুক্তরাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্তি | যুক্তরাষ্ট্র | ৩৬তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ, পরিচিতি পায় “ব্যাটল বর্ন স্টেট” হিসেবে। |
| ১৮৭৫ | সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের জন্ম | গুজরাট, ভারত | “ভারতের লৌহমানব” যিনি ৫৬৫টি দেশীয় রাজ্যকে একত্রিত করেছিলেন। |
| ১৮৭৬ | গ্রেট বাকেরগঞ্জ ঘূর্ণিঝড় | বরিশাল, বাংলাদেশ | প্রলয়ঙ্করী জলোচ্ছ্বাসে ২ লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানি। |
| ১৮৯২ | শার্লক হোমস প্রকাশিত | যুক্তরাজ্য | স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের আইকনিক গোয়েন্দা গল্পগ্রন্থের প্রকাশ। |
| ১৯২৬ | হ্যারি হুডিনির মৃত্যু | ডেট্রয়েট, যুক্তরাষ্ট্র | হ্যালোউইনের রাতে বিশ্বখ্যাত এস্কেপ আর্টিস্টের বিদায়। |
| ১৯৪১ | মাউন্ট রাশমোরের কাজ সম্পন্ন | সাউথ ডাকোটা, যুক্তরাষ্ট্র | ১৪ বছরের নিরলস পরিশ্রমের পর ভাস্কর্য নির্মাণ সমাপ্ত। |
| ১৯৮৪ | ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ড | নয়াদিল্লি, ভারত | ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যু, যার জেরে ব্যাপক রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়। |
| ২০০০ | আইএসএস-এ সয়ুজ মিশন লঞ্চ | বৈকানুর, কাজাখস্তান | মহাকাশে মানুষের নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতির সূচনা। |
| ২০১১ | “ডে অফ সেভেন বিলিয়ন” | জাতিসংঘ | বিশ্বের জনসংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে ৭০০ কোটিতে পৌঁছায়। |
বাঙালি বলয় এবং ভারতীয় উপমহাদেশ
দক্ষিণ এশিয়া ৩১ অক্টোবরে গভীর রূপান্তর, বীরত্বপূর্ণ জাতিগঠন এবং ভয়াবহ ট্র্যাজেডির সাক্ষী হয়েছে।
- ১৮৭৬ – দ্য গ্রেট বাকেরগঞ্জ সাইক্লোন (বরিশাল, বাংলাদেশ) ১৮৭৬ সালের ৩১ অক্টোবরের সন্ধ্যা। মেঘনা নদীর মোহনায় বাকেরগঞ্জ অঞ্চলে (বর্তমান বরিশাল, বাংলাদেশ) আছড়ে পড়ে এক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়। এই ঘূর্ণিঝড়ের ফলে ২০ থেকে ৪০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি হয়, যা মুহূর্তের মধ্যে ভাসিয়ে নিয়ে যায় উপকূলীয় নিম্নাঞ্চল, দ্বীপপুঞ্জ এবং নদীর তীরবর্তী জনপদ। ঘটনাস্থলেই ডুবে মারা যান প্রায় ১ লক্ষ মানুষ। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ভয়াবহতা এখানেই থেমে থাকেনি। ঝড়ের পরবর্তী দিনগুলোতে পানীয় জলের তীব্র সংকট ও দূষণের কারণে কলেরা এবং ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এতে আরও ১ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। সব মিলিয়ে ২ লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া এই ঘূর্ণিঝড়টি আজও মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাণঘাতী আবহাওয়া বিপর্যয় হিসেবে পরিচিত। এটি বেঙ্গল ডেল্টা বা বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের চরম জলবায়ু বিপর্যয়ের প্রতি দীর্ঘস্থায়ী ঝুঁকির এক করুণ দৃষ্টান্ত।
- ১৯৮৪ – প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ড (নয়াদিল্লি, ভারত) আধুনিক দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে সহিংস রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ভারতের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড। ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর নয়াদিল্লির ১ নম্বর সফদরজং রোডে নিজ বাসভবনের বাইরে তিনি গুলিতে নিহত হন। কয়েক মাস আগে অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে পরিচালিত সামরিক অভিযান ‘অপারেশন ব্লু স্টার’-এর প্রতিশোধ নিতে তাঁরই দুজন শিখ দেহরক্ষী, বিয়ন্ত সিং এবং সতবন্ত সিং, তাঁকে গুলি করেন। এই হত্যাকাণ্ডের পর উত্তর ভারতজুড়ে ভয়াবহ শিখ-বিরোধী দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে, হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং ভারতীয় রাজনীতির গতিপথ দশকের পর দশকের জন্য বদলে যায়।
দক্ষিণ এশিয়ার বিখ্যাত জন্ম ও মৃত্যু
-
সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল (জন্ম ১৮৭৫ – মৃত্যু ১৯৫০): গুজরাটের নাদিয়াদে জন্মগ্রহণ করা প্যাটেল মহাত্মা গান্ধীর পাশাপাশি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। স্বাধীন ভারতের প্রথম উপ-প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি ৫৬৫টি স্বায়ত্তশাসিত দেশীয় রাজ্যকে সফলভাবে ভারতীয় ইউনিয়নের সাথে যুক্ত করেন। তাঁর এই অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতি বছর তাঁর জন্মদিনটি ভারতজুড়ে ‘রাষ্ট্রীয় একতা দিবস’ বা জাতীয় ঐক্য দিবস হিসেবে পালিত হয়।
-
শচীন দেববর্মণ / এস. ডি. বর্মণ (জন্ম ১৯০৬ – মৃত্যু ১৯৭৫): ত্রিপুরার রাজপরিবারে জন্ম নেওয়া এস. ডি. বর্মণ ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী সংগীত পরিচালক ও নেপথ্য গায়ক। খাঁটি বাংলার লোকজ সুর, ভাটিয়ালি টান এবং শাস্ত্রীয় রাগকে আধুনিক সিনেমার সংগীতের সাথে মিশিয়ে তিনি এমন কিছু কালজয়ী সুর সৃষ্টি করেছেন, যা বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রের সোনালি যুগকে সংজ্ঞায়িত করে।
-
অমৃতা প্রীতম (মৃত্যু ৩১ অক্টোবর, ২০০৫): প্রখ্যাত পাঞ্জাবি কবি এবং ঔপন্যাসিক। দেশভাগের করুণ আখ্যান নিয়ে লেখা তাঁর উপন্যাস ‘পিঞ্জর’ এবং আইকনিক কবিতা ‘আখাঁ ওয়ারিস শাহ নু’-এর জন্য তিনি অমর হয়ে আছেন। তিনি ছিলেন প্রথম নারী যিনি সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন এবং দক্ষিণ এশীয় সাহিত্যে এক জোরালো নারীবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজের জায়গা করে নেন।
বৈশ্বিক ইতিহাস
যুক্তরাষ্ট্র
-
১৮৬৪ – নেভাডার অন্তর্ভুক্তি: আমেরিকান গৃহযুদ্ধের চরম উত্তেজনার মধ্যে নেভাডা যুক্তরাষ্ট্রের ৩৬তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের ইলেকটোরাল ভোট নিশ্চিত করার জন্য তড়িঘড়ি করে একে যুক্ত করা হয়। এই রাজ্যের স্থায়ী স্লোগান ও ডাকনাম হয়ে ওঠে “ব্যাটল বর্ন” (Battle Born)।
-
১৯১৩ – লিংকন হাইওয়ে উদ্বোধন: নিউইয়র্ক সিটির টাইমস স্কোয়ার থেকে সান ফ্রান্সিসকোর লিংকন পার্ক পর্যন্ত বিস্তৃত আমেরিকার প্রথম আনুষ্ঠানিক পাকা সড়ক নেটওয়ার্ক ‘লিংকন হাইওয়ে’ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। এটি মোটর পরিবহনের জগতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে।
-
১৯৪১ – মাউন্ট রাশমোরের সমাপ্তি: ভাস্কর গুটজন বোরগ্লুম এবং তার দল দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে পাথর খোদাই করার পর সাউথ ডাকোটায় মাউন্ট রাশমোর ন্যাশনাল মেমোরিয়ালের কাজ শেষ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা এবং তহবিলের অভাবে মূল পরিকল্পনার (প্রেসিডেন্টদের পূর্ণাঙ্গ বক্ষদেশ পর্যন্ত ভাস্কর্য) পরিবর্তে কেবল চারটি মাথা খোদাই করেই কাজ সমাপ্ত ঘোষণা করতে হয়।
রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপ
-
১৮১২ – আসলানদুজ যুদ্ধ: রুশো-পার্সিয়ান বা রুশ-পারস্য যুদ্ধের সময় জেনারেল পিওতর কোটলিয়ারেভস্কির নেতৃত্বে রুশ ইম্পেরিয়াল বাহিনী রাতের অন্ধকারে বিশাল কাজার পারস্য বাহিনীর ওপর অতর্কিত হামলা চালায় এবং এক চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে আনে।
-
১৯৬১ – ডি-স্ট্যালিনাইজেশন মাইলফলক: নিকিতা ক্রুশ্চেভের ‘ডি-স্ট্যালিনাইজেশন’ বা স্ট্যালিন-প্রভাব মুক্ত করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে, মস্কোর রেড স্কোয়ারে লেনিনের মাউসোলিয়ামে রাখা জোসেফ স্ট্যালিনের মমি করা মৃতদেহ সরিয়ে ফেলা হয় এবং ক্রেমলিনের দেয়ালের পাশে পুনরায় সমাহিত করা হয়।
চীন ও পূর্ব এশিয়া
-
১৮৮৭ – চিয়াং কাই-শেকের জন্ম: কুয়োমিনতাং (কেএমটি) জাতীয়তাবাদী দলের নেতা জেনারেলিসিমো চিয়াং কাই-শেক জন্মগ্রহণ করেন। তিনি চীনের জাতীয় সরকারের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৪৯ সালের পর তাইওয়ানে রিপাবলিক অফ চায়নার প্রেসিডেন্ট হন।
-
৬৮৩ – কাবার ক্ষতিসাধন (মধ্যপ্রাচ্যের প্রেক্ষাপট): ইসলামের আদি যুগে মক্কা অবরোধের সময় উমাইয়া বাহিনী এবং আবদুল্লাহ ইবনে আল-জুবায়েরের অনুগত বাহিনীর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ হয়। এই সময় সৃষ্ট আগুনে পবিত্র কাবা শরীফের কাঠামোগত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
যুক্তরাজ্য
-
১৮৯২ – দ্য অ্যাডভেঞ্চারস অব শার্লক হোমস প্রকাশ: স্যার আর্থার কোনান ডয়েল তাঁর জনপ্রিয় গোয়েন্দা গল্পগুলোর প্রথম সংকলন বই আকারে প্রকাশ করেন। এর মধ্য দিয়ে শার্লক হোমস এবং ডা. জন ওয়াটসন বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী চরিত্র হিসেবে চিরস্থায়ী আসন লাভ করেন।
-
১৯৪০ – ব্যাটল অব ব্রিটেনের সমাপ্তি: ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্স (RAF) নাৎসি জার্মানির লুফৎওয়াফের দিন-রাতের বিমান হামলার বিরুদ্ধে ব্রিটেনের আকাশসীমা রক্ষার লড়াইয়ে সফল পরিণতি টানে। এর ফলে অ্যাডলফ হিটলার তার ‘অপারেশন সি লায়ন’ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাতিল করতে বাধ্য হন।
-
১৯৫৬ – সুয়েজ সংকটের তীব্রতা বৃদ্ধি: সুয়েজ খাল পুনরায় খুলে দেওয়া এবং এর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য যৌথ ব্রিটিশ ও ফরাসি বিমান বাহিনী মিসরের বিমানঘাঁটিগুলোতে সুনির্দিষ্ট বোমা হামলা শুরু করে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
ইউরোপ
-
১৫১৭ – প্রোটেস্ট্যান্ট রিফর্মেশনের সূচনা: জার্মান সন্ন্যাসী এবং ধর্মতত্ত্ববিদ মার্টিন লুথার উইটেনবার্গের অল সেইন্টস চার্চের দরজায় তাঁর ঐতিহাসিক ‘৯৫ থিসিস’ পেরেক দিয়ে আটকে দেন। ক্যাথলিক গির্জায় অর্থের বিনিময়ে পাপমোচন বা ‘ইনডালজেন্স’ বিক্রির তীব্র সমালোচনা করে তোলা এই পদক্ষেপ ইউরোপজুড়ে প্রোটেস্ট্যান্ট রিফর্মেশনের আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
-
১৯১৮ – অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির পতন: বুদাপেস্টে সংঘটিত অ্যাস্টার বিপ্লবের ফলে হাঙ্গেরি আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ট্রিয়ার সাথে তার ইউনিয়ন ছিন্ন করে। এর মাধ্যমে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির দ্বৈত রাজতন্ত্রের পতন ঘটে।
-
১৯২২ – ইতালিতে মুসোলিনির ক্ষমতা দখল: ‘মার্চ অন রোম’-এর পর বেনিতো মুসোলিনি ইতালির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং বিশ্বের প্রথম ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।
বিশ্বের অন্যান্য প্রান্ত
-
২০০০ – আইএসএস-এ প্রথম স্থায়ী ক্রু: কাজাখস্তানের বৈকানুর কসমোড্রোম থেকে ‘সয়ুজ টিএম-৩১’ মহাকাশযানটি এক্সপিডিশন-১ এর মহাকাশচারী উইলিয়াম শেফার্ড এবং কসমোনট সের্গেই ক্রিকালেভ ও ইউরি গিদজেনকোকে নিয়ে যাত্রা করে। এটি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে মানুষের নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতির সূচনা করে, যা আজও অব্যাহত।
-
২০১১ – “ডে অফ সেভেন বিলিয়ন”: জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে ৩১ অক্টোবরকে সেই মাইলফলক তারিখ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যেদিন পৃথিবীর মোট জনসংখ্যা ৭০০ কোটির (৭ বিলিয়ন) ঘর অতিক্রম করে।
আন্তর্জাতিক দিবস ও পালনীয়
-
হ্যালোউইন / অল হ্যালোস ইভ: উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে পালিত একটি উৎসব। প্রাচীন কেল্টিক উৎসব সামহেইন থেকে উদ্ভূত এই দিনটি অল সেইন্টস ডে-র প্রাক্কালে পালিত হয়, যা শীতের আগমনী বার্তা দেয়।
-
বিশ্ব শহর দিবস (জাতিসংঘ): বিশ্বব্যাপী নগরায়নের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে, দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে এবং শহরাঞ্চলে টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এই দিবসটি প্রতিষ্ঠা করে।
-
বিশ্ব সঞ্চয় দিবস: ১৯২৪ সালের ৩১ অক্টোবর ইতালির মিলানে অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক সেভিংস ব্যাংক কংগ্রেসে বিশ্বজুড়ে আর্থিক সাক্ষরতা এবং সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই দিনটির সূচনা হয়।
-
রিফর্মেশন ডে: ১৫১৭ সালে মার্টিন লুথারের ৯৫ থিসিস প্রকাশের ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করে মূলত লুথেরান এবং প্রোটেস্ট্যান্ট সম্প্রদায় এই দিনটি উদযাপন করে।
-
রাষ্ট্রীয় একতা দিবস (ভারত): সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের অসামান্য নেতৃত্ব এবং তাঁর রেখে যাওয়া ঐতিহ্যকে সম্মান জানাতে ভারতে প্রতি বছর এই দিনে জাতীয় ঐক্য দিবস পালিত হয়।
বিখ্যাত ব্যক্তিদের জন্মবার্ষিকী
-
কাতসুশিকা হোকুসাই (১৭৬০ – ১৮৪৯): এডো যুগের প্রখ্যাত জাপানি উকিউ-ই (Ukiyo-e) শিল্পী ও ছাপচিত্রী। তিনি বিশ্ববিখ্যাত উডব্লক প্রিন্ট সিরিজ ‘থার্টি সিক্স ভিউজ অফ মাউন্ট ফুজি’ তৈরি করেন, যার মধ্যে আইকনিক ‘দ্য গ্রেট ওয়েভ অফ কানাগাওয়া’ অন্তর্ভুক্ত। তাঁর শৈল্পিক ধারা ক্লদ মোনে এবং ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের মতো ইউরোপীয় ইম্প্রেশনিস্টদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
-
জন কিটস (১৭৯৫ – ১৮২১): ইংরেজি রোমান্টিক কবিতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব। মাত্র ২৫ বছর বয়সে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে অকালমৃত্যু হলেও তিনি ‘ওড টু আ নাইটিঙ্গেল’, ‘ওড অন আ গ্রিসিয়ান আর্ন’ এবং ‘টু অটাম’-এর মতো অমর সৃষ্টি রেখে গেছেন।
-
মাইকেল কলিন্স (১৯৩০ – ২০২১): আমেরিকান মহাকাশচারী এবং টেস্ট পাইলট, যিনি ১৯৬৯ সালে অ্যাপোলো ১১ মিশনে কমান্ড মডিউল পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নিল আর্মস্ট্রং এবং বাজ অলড্রিন যখন চাঁদের বুকে হাঁটছিলেন, কলিন্স তখন চাঁদের কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করছিলেন। চাঁদের দূরবর্তী অংশে থাকার সময় পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় তাঁকে প্রায়শই ইতিহাসের “সবচেয়ে একাকী মানুষ” হিসেবে অভিহিত করা হয়।
-
জাহা হাদিদ (১৯৫০ – ২০১৬): ইরাকি-ব্রিটিশ স্থপতি, যাঁর যুগান্তকারী এবং ডিকনস্ট্রাকটিভিস্ট নকশা আধুনিক স্থাপত্যের নান্দনিকতাকে বদলে দিয়েছে। ২০০৪ সালে তিনি প্রথম নারী হিসেবে সম্মানজনক প্রিটজকার আর্কিটেকচার প্রাইজ লাভ করেন। তাঁর বিখ্যাত কাজের মধ্যে রয়েছে বাকুর হায়দার আলিয়েভ সেন্টার এবং বেইজিং দাক্সিং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
মৃত্যুবার্ষিকী
-
এগন শিলে (১৮৯০ – ১৯১৮): অস্ট্রিয়ান এক্সপ্রেশনিস্ট চিত্রশিল্পী, যিনি তাঁর মনস্তাত্ত্বিকভাবে তীব্র এবং বাস্তবধর্মী প্রতিকৃতির জন্য পরিচিত। ১৯১৮ সালের ভয়াবহ স্প্যানিশ ফ্লু মহামারীতে ২৮ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তাঁর গর্ভবতী স্ত্রী একই রোগে মারা যাওয়ার মাত্র তিন দিন পর তাঁর মৃত্যু হয়।
-
হ্যারি হুডিনি (১৮৭৪ – ১৯২৬): হাঙ্গেরীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান এস্কেপ আর্টিস্ট এবং স্টান্ট পারফর্মার। হাতকড়া, স্ট্রেইটজ্যাকেট এবং জলভর্তি পাত্র থেকে জাদুকরী কায়দায় বেরিয়ে আসার জন্য বিখ্যাত হুডিনি হ্যালোউইনের রাতে অ্যাপেন্ডিক্স ফেটে যাওয়ার কারণে পেরিটোনাইটিসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর প্রতি বছর হ্যালোউইনের রাতে জাদুকরেরা তাঁর আত্মাকে ডাকার জন্য ‘সিয়ান্স’ বা প্রেতচক্রের আয়োজন করে থাকেন।
-
ফেদেরিকো ফেলিনি (১৯২০ – ১৯৯৩): ইতালীয় কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা, যাঁর ফ্যান্টাসি, স্মৃতি এবং বারোক চিত্রকল্পের অনন্য মিশ্রণ বিংশ শতাব্দীর সিনেমাকে নতুন রূপ দিয়েছিল। চারবার শ্রেষ্ঠ বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্রের জন্য অস্কার বিজয়ী ফেলিনির মাস্টারপিসগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘লা স্ত্রাদা’, ‘নাইটস অফ কাবিরিয়া’, ‘লা দোলচে ভিতা’ এবং ‘এইট অ্যান্ড আ হাফ’।
-
শন কনারি (১৯৩০ – ২০২০): একাডেমি পুরস্কার বিজয়ী স্কটিশ অভিনেতা, যিনি জেমস বন্ড চরিত্রে অভিনয় করে আন্তর্জাতিক তারকাখ্যাতি লাভ করেন। তিনি সাতটি বন্ড চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন এবং ‘দ্য আনটাচেবলস’ (১৯৮৭) চলচ্চিত্রে তাঁর অসামান্য অভিনয়ের জন্য অস্কার জেতেন।
“আপনি কি জানেন?” – ঐতিহাসিক ট্রিভিয়া
১. ১৮৭৬ সালের ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী মৃত্যুহার: ১৮৭৬ সালের ভয়াবহ বাকেরগঞ্জ ঘূর্ণিঝড়ে ঝড় আঘাত হানার দিন যত মানুষ মারা গিয়েছিল, তার চেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল পরবর্তী দুই সপ্তাহে। জলোচ্ছ্বাস এবং ধ্বংসস্তূপের কারণে বাংলা জুড়ে মিঠা পানির উৎসগুলো দূষিত হয়ে পড়ে, যার ফলে খুব দ্রুত কলেরা এবং আমাশয়ের মতো মহামারী ছড়িয়ে পড়ে।
২. মাউন্ট রাশমোরের অসমাপ্ত পরিকল্পনা: মাউন্ট রাশমোরের মূল স্থাপত্য ব্লুপ্রিন্টে জর্জ ওয়াশিংটন, থমাস জেফারসন, থিওডোর রুজভেল্ট এবং আব্রাহাম লিংকনের কোমর থেকে ওপরের অংশ পর্যন্ত খোদাই করার কথা ছিল। কিন্তু ১৯৪১ সালের শুরুতে ভাস্কর গুটজন বোরগ্লুমের আকস্মিক মৃত্যু এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে কংগ্রেস তহবিল বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়, ফলে শুধু প্রেসিডেন্টদের মাথাগুলোই খোদাই করা সম্ভব হয়েছিল।
৩. হুডিনির কিংবদন্তি প্রেতচক্র (Séance): ১৯২৬ সালের ৩১ অক্টোবর মৃত্যুর আগে হ্যারি হুডিনি তার স্ত্রী বেসের সাথে দশ শব্দের একটি গোপন কোড ঠিক করেছিলেন, যা শুধু তাঁরা দুজনই জানতেন। মৃত্যুর পর টানা দশ বছর ধরে বেস প্রতি হ্যালোউইনের রাতে প্রেতচক্র বা সিয়ান্সের আয়োজন করতেন, এটা পরীক্ষা করার জন্য যে কোনো মাধ্যম বা মিডিয়াম হুডিনির সেই গোপন কোডটি শুনতে পায় কি না। যদিও বেস কখনোই সেই কোড পাননি, তবে প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে জাদুকররা এখনো এই “অফিসিয়াল হুডিনি সিয়ান্স” ঐতিহ্য মেনে চলেন।
শেষ কথা
৩১ অক্টোবর মানব ইতিহাসের এক সুদীর্ঘ ও ঘটনাবহুল দর্পণ হিসেবে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এটি এমন একটি দিন যেখানে আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য, স্থাপত্যের বিশাল অর্জন, হৃদয়বিদারক প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং রাজনৈতিক পালাবদল একে অপরের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। বরিশালের সেই ভয়াল জলোচ্ছ্বাস স্মরণ করা হোক, সর্দার প্যাটেলের রাজনৈতিক বিচক্ষণতাকে সম্মান জানানো হোক, মার্টিন লুথারের সাহসিকতা নিয়ে ভাবা হোক, কিংবা বৈশ্বিক শিল্প ও বিজ্ঞানের অর্জন উদযাপন করা হোক—৩১ অক্টোবর বারবার আমাদের মনে করিয়ে দেয় কীভাবে সময়ের একটি নির্দিষ্ট মুহূর্ত প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের জীবনে প্রতিধ্বনিত হতে পারে।


