খাবারের প্লেট সামনে, কিন্তু শিশুর চোখ মোবাইলে। কার্টুন বন্ধ করলেই কান্না। আবার কখনও অফিসের জরুরি কাজ বা রান্না সামলাতে নিজেরাই ফোনটা এগিয়ে দিই—“একটু দেখো, আমি কাজটা শেষ করি।”
ছোট সন্তান রয়েছে, এমন বহু পরিবারেই এই দৃশ্য পরিচিত। তাই শিশুর স্ক্রিন টাইম নিয়ে কথা বলার সময় বাবা-মায়ের ব্যস্ততা, ক্লান্তি ও বাস্তব পরিস্থিতিও মাথায় রাখা দরকার।
কিন্তু কতক্ষণ দেখানো ঠিক? শিক্ষামূলক ভিডিও দেখলেও কি সময় বেঁধে দিতে হবে? বেশি স্ক্রিন দেখলে কি সত্যিই মস্তিষ্ক ও ভাষা বিকাশে প্রভাব পড়ে?
ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্স বা IAP-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, ২–৫ বছরের শিশুর দৈনিক মোট স্ক্রিন টাইম (Screen Time for Kids) এক ঘণ্টার বেশি হওয়া উচিত নয়; কম হলে আরও ভালো। এটি প্রতিদিন পূরণ করার লক্ষ্য নয়।
সময়ের পাশাপাশি শিশু কী দেখছে, কার সঙ্গে দেখছে এবং স্ক্রিনের জন্য তার ঘুম, খেলা বা কথাবার্তার সুযোগ কমছে কি না—সেটিও দেখতে হবে।
এক নজরে মনে রাখুন
- ২–৫ বছরে দৈনিক মোট স্ক্রিন টাইম সর্বোচ্চ এক ঘণ্টার মধ্যে রাখুন; কম হলে ভালো।
- বয়সোপযোগী বিষয় বেছে নিন এবং সম্ভব হলে একসঙ্গে দেখুন।
- খাবারের সময় ফোন সরিয়ে রাখার অভ্যাস তৈরি করুন।
- শোওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা আগে স্ক্রিন বন্ধ করুন।
- ঘুম, খেলাধুলা ও পরিবারের সঙ্গে কথাবার্তার সময়কে অগ্রাধিকার দিন।
স্ক্রিন টাইম বলতে কী বোঝায়?
স্ক্রিন টাইম হল মোবাইল, টেলিভিশন, ট্যাবলেট, কম্পিউটার বা অন্য কোনও ডিজিটাল পর্দা দেখে কিংবা ব্যবহার করে কাটানো সময়। কার্টুন, ছড়ার ভিডিও, ডিজিটাল গেম ও শিক্ষামূলক অ্যাপ—সবই এর মধ্যে পড়ে।
ধরা যাক, শিশু সকালে টিভিতে ২০ মিনিট কার্টুন দেখল, দুপুরে মোবাইলে ১৫ মিনিট ছড়া দেখল এবং বিকেলে ট্যাবলেটে ২৫ মিনিট খেলল। সব মিলিয়ে স্ক্রিন টাইম এক ঘণ্টা। শুধু মোবাইলের সময় গুনলে পুরো হিসাবটি পাওয়া যাবে না।
শিক্ষামূলক ভিডিওর সময়ও লিখে রাখুন। ‘পড়াশোনার জিনিস’ বলেই সেটিকে হিসাবের বাইরে রাখার কারণ নেই।
তবে একা একের পর এক ভিডিও দেখা, বড়দের সঙ্গে গল্প দেখে আলোচনা করা এবং ভিডিও কলে দাদু-দিদার সঙ্গে কথা বলা—এই অভিজ্ঞতাগুলির ধরন আলাদা। সময়ের খাতায় ব্যবহারের উদ্দেশ্যও লিখলে অভ্যাসটি বুঝতে সুবিধা হবে।
বয়স অনুযায়ী কতটা স্ক্রিন টাইম ঠিক?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা WHO দুই বছর এবং তিন–চার বছরের শিশুদের বসে স্ক্রিন দেখার সময় দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা রাখার পরামর্শ দেয়। পাঁচ বছর বয়সের জন্য এখানে IAP-এর নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়েছে।
| শিশুর বয়স | দৈনিক স্ক্রিন টাইমের নির্দেশনা | |
| ২ বছর | সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা; কম হলে ভালো | |
| ৩–৪ বছর | সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা; কম হলে ভালো | |
| ৫ বছর | সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা; কম হলে ভালো |
WHO-এর উল্লিখিত নির্দেশিকাটি পাঁচ বছরের কম বয়সিদের জন্য। তাই পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়া শিশুকে সেই নির্দেশিকার বয়সসীমায় ধরা হচ্ছে না।
এই সীমার অর্থ একটানা এক ঘণ্টা দেখানো নয়। ছোট পর্বে সময় রাখতে পারেন। শিশু যদি কোনও দিন স্ক্রিন ছাড়াই আনন্দে থাকে, তাকে আলাদা করে ভিডিও দেখানোর দরকার নেই।
আবার এক ঘণ্টার মধ্যে থাকলেই যে যেকোনও বিষয় দেখানো উপযুক্ত, তা-ও নয়। বিষয়বস্তু এবং ব্যবহারের পরিস্থিতি খেয়াল রাখা জরুরি।
শিশুর মস্তিষ্কের ওপর প্রভাব: গবেষণা কী বলছে?
“মোবাইল দেখলেই বাচ্চার মস্তিষ্ক নষ্ট হয়”—এমন দাবি ভয় তৈরি করে, কিন্তু গবেষণাকে যথাযথভাবে বোঝায় না।
মস্তিষ্কের স্ক্যানে কী দেখা গিয়েছিল?
JAMA Pediatrics-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সি ৪৭ জন শিশুর মস্তিষ্কের বিশেষ ধরনের এমআরআই করা হয়।
স্ক্রিন ব্যবহারের একটি সম্মিলিত সূচকে বেশি স্কোরের সঙ্গে ভাষা ও প্রাথমিক পড়ার দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত কিছু সাদা পদার্থের স্নায়ুপথের গঠনগত সূচকে পার্থক্য পাওয়া যায়। সাদা পদার্থের স্নায়ুতন্তু মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যোগাযোগে সাহায্য করে। গবেষণার স্ক্রিন মূল্যায়নে সময়ের পাশাপাশি বিষয়বস্তু ও বড়দের সঙ্গে দেখার অভ্যাসও ছিল।
এটি কি স্থায়ী ক্ষতির প্রমাণ?
না। গবেষণাটি ছোট এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ে করা পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা। ফলে স্ক্রিনই ওই পার্থক্যের কারণ কি না, তা নিশ্চিত করা যায়নি। স্থায়ী মস্তিষ্কের ক্ষতি বা কোনও শিশুর ভবিষ্যৎ বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কেও এটি সিদ্ধান্ত দেয় না। গবেষকেরা আরও অনুসন্ধানের প্রয়োজন জানিয়েছেন।
গবেষণায় সম্পর্ক পাওয়া মানেই সরাসরি কারণ প্রমাণিত হওয়া নয়। পারিবারিক পরিবেশ, শিশুর অন্যান্য অভিজ্ঞতা ও গবেষণার সীমাবদ্ধতাও বিবেচ্য।
অভিভাবকের জন্য বাস্তবে কাজে লাগানোর প্রশ্ন হল: ভিডিও দেখতে গিয়ে শিশুর কোন কাজটি বাদ পড়ছে? বিকেলের খেলা? গল্প শোনা? নাকি সময়মতো ঘুম?
এগুলি লক্ষ্য করে রুটিন বদলানো সম্ভব—আতঙ্ক ছাড়াই।
ভাষা বিকাশ: কেন বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ?
শিশু ভিডিও দেখে ইংরেজি ছড়া বলতে পারলে আনন্দ হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু ভাষাদক্ষতা শুধু মুখস্থ শব্দ বা ছড়ায় সীমাবদ্ধ নয়। অন্যের কথা বোঝা, নিজের প্রয়োজন জানানো এবং কথোপকথনে অংশ নেওয়াও এর অংশ।
NIDCD-এর তথ্য অনুযায়ী, জীবনের প্রথম তিন বছর কথা ও ভাষা শেখার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। মানুষের ভাষা শোনা ও ব্যবহারের সমৃদ্ধ পরিবেশ এই বিকাশে সহায়ক। এর অর্থ অবশ্য তিন বছর পরে শেখার সুযোগ শেষ হয়ে যায় না।
বড় গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?
২০২০ সালে JAMA Pediatrics-এ প্রকাশিত একটি সমন্বিত বিশ্লেষণে ৪২টি গবেষণার ১৮,৯০৫ জন শিশুর তথ্য পর্যালোচনা করা হয়।
বেশি স্ক্রিন টাইম এবং ব্যাকগ্রাউন্ডে টিভি চলার সঙ্গে তুলনামূলক দুর্বল ভাষাদক্ষতার ছোট মাত্রার সম্পর্ক পাওয়া যায়। শিক্ষামূলক বিষয় দেখা ও অভিভাবকের সঙ্গে একসঙ্গে দেখার সঙ্গে তুলনামূলক ভালো ভাষাদক্ষতার সম্পর্ক ছিল।
তবে অংশগ্রহণকারীরা সবাই ২–৫ বছরের ছিল না। ফলটি থেকে স্ক্রিনই ভাষা বিকাশে দেরির একমাত্র কারণ বা সব শিশুর ওপর একই প্রভাব পড়বে—কোনওটিই বলা যায় না।
মুখোমুখি কথাবার্তায় বাড়তি কী সুযোগ থাকে?
শিশু বলল, “গাড়ি!”
আপনি বললেন, “হ্যাঁ, লাল গাড়িটা যাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে মনে হয়?”
সে উত্তর দিল, “বাড়ি।”
এই ছোট কথোপকথনে শিশুর আগ্রহ অনুযায়ী আলোচনা এগোচ্ছে। সে নিজের কথা বলছে এবং আপনার প্রতিক্রিয়া পাচ্ছে। আগে থেকে রেকর্ড করা ভিডিও তার উত্তরের সঙ্গে এভাবে কথোপকথন বদলাতে পারে না।
বাড়িতে চেষ্টা করতে পারেন:
- শিশুর ছোট কথাকে একটু বাড়িয়ে বলা: “বল” বললে “হ্যাঁ, বড় লাল বল।”
- পোশাক পরানো বা খেলনা গোছানোর সময় কাজটি নিয়ে কথা বলা।
- ছবির বই দেখে একসঙ্গে গল্প বানানো।
- প্রশ্ন করার পর শিশুকে উত্তর দেওয়ার সময় দেওয়া।
- ভিডিওতে দেখা কোনও বিষয় পরে বাস্তব জিনিস বা খেলার সঙ্গে মিলিয়ে দেখানো।
প্রতিটি কথোপকথনকে পরীক্ষা বানানোর দরকার নেই। আরাম করে কথা বলার সুযোগ থাকুক।
কথা বলতে দেরি হলে কী করবেন?
শ্রবণসমস্যা বা ভাষাগত বিকাশের অসুবিধাসহ বিভিন্ন কারণে কথা বলতে দেরি হতে পারে। তাই শুধু ফোনকে দায়ী করা কিংবা স্ক্রিন বন্ধ করলেই সব ঠিক হবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
উদ্বেগ থাকলে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলুন। প্রয়োজনে শ্রবণ পরীক্ষা ও স্পিচ-ল্যাঙ্গুয়েজ বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন করা হয়।
বাবা-মায়ের অপরাধবোধ বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হয় না। শিশুর প্রয়োজন বোঝা এবং সময়মতো সাহায্য নেওয়াই বেশি জরুরি।
শিশু না দেখলেও পাশে টিভি চললে কী খেয়াল করবেন?
শিশু মেঝেতে খেলছে, আর পাশে টিভি চলছে—অনেক বাড়িতেই এটি স্বাভাবিক দৃশ্য। একে বলা হয় ব্যাকগ্রাউন্ড টেলিভিশন।
শিশু সরাসরি কতক্ষণ দেখছে, তার থেকে এই সময় আলাদা করে নোট করতে পারেন। এতে বাড়ির স্ক্রিনের পরিবেশটি বোঝা সহজ হবে।
কেউ না দেখলে টিভি বন্ধ রাখুন। বিশেষ করে গল্প পড়া, একসঙ্গে খাওয়া বা কথাবার্তার সময় এটি করে দেখতে পারেন। শুধু শিশুর হাতে ফোন নেই বলেই চারপাশে স্ক্রিনের উপস্থিতি নেই—এমন ধরে নেবেন না।
ঘুম, খেলা ও দৈনন্দিন রুটিনে কী খেয়াল করবেন?
অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে ঘুমে ব্যাঘাত, চোখে অস্বস্তি ও শারীরিক সক্রিয়তা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা জড়িত থাকতে পারে। IAP শোওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা আগে স্ক্রিন বন্ধ রাখতে বলে।
নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করুন:
- ভিডিও শেষ করতে গিয়ে কি নিয়মিত শোওয়া পিছিয়ে যাচ্ছে?
- খেলনা বা বাইরে খেলার জন্য পর্যাপ্ত সময় থাকছে?
- পরিবারের সঙ্গে কথা বলার নিরবচ্ছিন্ন সুযোগ পাচ্ছে?
- খাওয়া বা অপেক্ষা করার প্রতিটি মুহূর্তেই কি ফোন দিতে হচ্ছে?
WHO শিশুদের দিনের সামগ্রিক ভারসাম্যে ঘুম, সক্রিয় খেলা ও বড়দের সঙ্গে বই পড়া বা গল্প করার সুযোগকে গুরুত্ব দেয়।
তবে শিশুর প্রতিটি অসুবিধার কারণ স্ক্রিন নয়। সমস্যার ধরন, কতদিন ধরে হচ্ছে এবং দৈনন্দিন জীবনে তার প্রভাব—সব মিলিয়ে দেখতে হবে।
শিক্ষামূলক ভিডিও বেছে নেবেন কীভাবে?
‘লার্নিং’ লেখা থাকলেই কোনও ভিডিও আপনার শিশুর জন্য উপযুক্ত হয়ে যায় না। চালিয়ে দেওয়ার আগে নিজে কিছুটা দেখে নিন।
বিষয়টি বয়স অনুযায়ী বোধগম্য কি না, ভয় বা হিংসার দৃশ্য আছে কি না, বিজ্ঞাপন বারবার আসছে কি না—খেয়াল করুন। UNICEF বয়সোপযোগী বিষয় নির্বাচন, একসঙ্গে দেখা এবং প্রয়োজনে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল ব্যবহারের পরামর্শ দেয়।
বাড়ির জন্য কয়েকটি নিয়ম করতে পারেন:
- আগে থেকে একটি নির্দিষ্ট ভিডিও নির্বাচন করুন।
- সুযোগ থাকলে অটোপ্লে বন্ধ রাখুন।
- শিশুকে নিজের মতো পরপর ভিডিও বেছে নিতে না দিয়ে নজর রাখুন।
- দেখা শেষ হলে সেটি নিয়ে একটু কথা বলুন।
ভিডিওতে বৃষ্টি দেখলে পরে জানলার কাছে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখতে পারেন। কোনও প্রাণী দেখলে তার হাঁটাচলা অভিনয় করুন। দেখা বিষয়টি নিয়ে বাস্তবে কিছু করার সুযোগ তৈরি হোক।
খাওয়ার সময় মোবাইল চাইলে কী করবেন?
“মোবাইল না দিলে খায় না”—এই অভ্যাস বদলাতে পরিবারের প্রস্তুতি দরকার।
প্রথমে দিনের এমন একটি খাবারের সময় বেছে নিন, যখন তাড়াহুড়ো কম। আগে থেকে বলুন, “আজ খাবার সময় ফোনটা এখানে থাকবে। আমরা একসঙ্গে বসব।”
খাবার নিয়ে সহজ কথা বলুন এবং শিশুকে নিজের মতো খাওয়ার সুযোগ দিন। প্রথম কয়েকটি চেষ্টা অস্বস্তিকর হতে পারে। তাই প্রতিদিন নতুন নিয়ম না করে একই পরিকল্পনা ধরে এগোন।
খাওয়া নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, গিলতে অসুবিধা বা বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সেটিকে শুধু মোবাইলের অভ্যাসের সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাবেন না।
ব্যস্ত অভিভাবকদের বাস্তব পরিস্থিতি: সব সময় পাশে বসা সম্ভব না হলে কী করবেন?
রান্না চাপানো হয়েছে, অফিস থেকে ফোন আসছে, আর সেই সময়েই শিশু বলছে, “আমার সঙ্গে খেলো!” এমন পরিস্থিতিতে প্রতিবার সব কাজ ছেড়ে বসে পড়া সম্ভব হয় না। অনেক পরিবারে শিশুকে দেখাশোনার দায়িত্বও একজনকেই সামলাতে হয়।
তাই স্ক্রিনের অভ্যাস বদলানোর পরিকল্পনা পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মানানসই হওয়া দরকার। কখন সবচেয়ে বেশি ফোন দিতে হচ্ছে, সেই সময়টির জন্য ছোট প্রস্তুতি দিয়ে শুরু করুন।
রান্না বা ঘরের কাজের সময়
আপনার নজরের মধ্যে, তবে আগুন, গরম বাসন ও ধারালো জিনিস থেকে দূরে শিশুর জন্য নিরাপদ খেলার জায়গা রাখুন। সেখানে বড় ব্লক, ছবির বই বা বয়সোপযোগী খেলনা দিতে পারেন।
ছোট কোনও কাজেও তাকে অংশ নিতে দিতে পারেন—যেমন পরিষ্কার রুমাল ভাঁজ করা বা বড় প্লাস্টিকের বাটি একটির মধ্যে আরেকটি সাজানো। বলুন, “আমি রান্নাটা করছি, তুমি এখানে তোমার কাজটা করো।”
এগুলি শিশুকে নজরদারি ছাড়া রেখে দেওয়ার বিকল্প নয়। বয়স অনুযায়ী পাশে থাকা ও খোঁজ নেওয়া জরুরি।
বাড়ি থেকে অফিসের কাজ করার সময়
জরুরি মিটিংয়ের আগে সম্ভব হলে কিছুক্ষণ শিশুর সঙ্গে মন দিয়ে খেলুন। তারপর সহজ করে জানান, “এবার আমাকে একটু কথা বলতে হবে। তুমি এই ছবিটায় রং করো, আমি পাশেই আছি।”
কাজের ফাঁকে ছোট বিরতি রাখা সম্ভব হলে তখন তার কাছে যান। দীর্ঘক্ষণ নিজের মতো ব্যস্ত থাকবে—এমন প্রত্যাশা না রেখে ছোট কাজ দিন। বাড়িতে অন্য কোনও পরিচর্যাকারী থাকলে জরুরি মিটিংয়ের সময়টি আগে থেকেই ভাগ করে নিতে পারেন।
বাইরে অপেক্ষা বা যাতায়াতের সময়
একটি ছোট ‘খেলার ব্যাগ’ তৈরি রাখুন। তাতে থাকতে পারে:
- পাতলা ছবির বই।
- ছোট খাতা ও মোটা রং-পেনসিল।
- বয়সোপযোগী, বড় আকারের নিরাপদ খেলনা।
অপেক্ষার সময় আশপাশের রং খোঁজা, গাড়ি গোনা বা ছোট গল্প বানানোও চেষ্টা করতে পারেন। শিশুকে সব সময় ব্যস্ত রাখার চাপ নেই; কখনও শুধু পাশে বসে কথাও বলুন।
কোনও দিন স্ক্রিন দিতেই হলে
আগে থেকে বেছে রাখা একটি বয়সোপযোগী ভিডিও চালান। কতটুকু দেখবে জানিয়ে দিন, অটোপ্লে বন্ধ রাখুন এবং সময়টি দৈনিক মোট হিসাবের মধ্যে ধরুন। সম্ভব হলে সাধারণ ঘরে দেখান, যেখানে কী চলছে আপনি খেয়াল করতে পারবেন।
একটি কঠিন দিনে পরিকল্পনা পুরোপুরি মানা না গেলে নিজেকে দোষারোপ করবেন না। পরে ভাবুন, ওই পরিস্থিতি আবার এলে কী প্রস্তুতি সাহায্য করতে পারে।
লক্ষ্য এমন একটি রুটিন তৈরি করা, যা পরিবারের পক্ষে নিয়মিত অনুসরণ করা সম্ভব। শুরুটা হতে পারে রান্নার সময়ের একটি খেলার বাক্স বা অফিসের ফোনের আগে কিছুক্ষণ একসঙ্গে গল্প করা দিয়ে।
স্ক্রিন টাইম কমানোর সহজ পরিকল্পনা
নিচের ধাপগুলি রুটিন তৈরির ব্যবহারিক উদাহরণ। নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে অভ্যাস বদলে দেওয়ার নিশ্চয়তা নয়।
১. আগে বর্তমান সময়ের হিসাব নিন
দু’তিন দিন লিখুন কখন, কতক্ষণ এবং কেন স্ক্রিন দেওয়া হচ্ছে। রান্নার সময়? কাজের ফোন সামলাতে? নাকি শিশুকে শান্ত করতে?
প্রয়োজনটি বুঝলে বিকল্প পরিকল্পনা করা সহজ হয়।
২. একটি পরিবর্তন দিয়ে শুরু করুন
প্রথম লক্ষ্য হতে পারে, “খাওয়ার সময় ফোন থাকবে না” অথবা “বিকেলের নির্দিষ্ট সময়ে একটি গল্প দেখা হবে।”
অনেক বেশি সময় দেখার অভ্যাস থাকলে ধাপে ধাপে কমানোর পরিকল্পনা করতে পারেন। শিশুর প্রতিক্রিয়া ও পরিবারের বাস্তব পরিস্থিতি দেখে এগোন।
৩. শুরুতেই শেষের কথা জানান
ভিডিও চালানোর আগে বলুন, “এই গল্পটা শেষ হলে বন্ধ করব।” শেষ হওয়ার কিছু আগে মনে করিয়ে দিন।
এরপর কী করবে, সেটিও জানিয়ে রাখুন: “তারপর ছবি আঁকবে, না ব্লক দিয়ে বাড়ি বানাবে?”
৪. বিকল্প হাতের কাছে রাখুন
ফোন সরিয়ে নেওয়ার পর কী করবে, তা নিয়ে যেন নতুন করে খুঁজতে না হয়। রং-পেনসিল, ছবির বই, বড় ব্লক বা পছন্দের খেলনা প্রস্তুত রাখুন।
প্রতিদিন নতুন খেলনা কেনার দরকার নেই। কিছু খেলনা পালা করে সামনে রাখলেও পরিকল্পনা করা সহজ হতে পারে।
৫. বড়রা একই নিয়ম মানুন
মা, বাবা, দাদু-দিদা বা অন্য যিনি দেখাশোনা করেন, সবাই সময় ও বিষয় নিয়ে একমত থাকুন। বড়দের নিজেদের ফোন ব্যবহারের অভ্যাসও খেয়াল করা দরকার। পারিবারিকভাবে নিয়ম তৈরি ও নিজের আচরণের দিকে নজর দেওয়ার ওপর UNICEF জোর দেয়।
ফোন বন্ধ করলে কান্না করলে কী বলবেন?
কান্না করলেই শিশুকে ‘আসক্ত’ বলে চিহ্নিত করবেন না। শান্তভাবে ছোট বাক্যে কথা বলুন:
“তোমার আরও দেখতে ইচ্ছে করছে, বুঝতে পারছি। আজ দেখা শেষ। আমি তোমার পাশে আছি।”
তারপর একটি সহজ পছন্দ দিন: “ছবি আঁকবে, না পুতুল নিয়ে খেলবে?”
মন খারাপ সঙ্গে সঙ্গে চলে যাবে, এমন আশা করবেন না। এই সময় লম্বা বক্তৃতা বা অন্য শিশুর সঙ্গে তুলনা এড়িয়ে চলুন। নিয়ম বজায় রেখেও পাশে থাকা যায়।
ঘুমের আগে স্ক্রিনের বদলে কী রাখবেন?
শুধু ফোন বন্ধ করলেই ঘুমের প্রস্তুতি তৈরি হয়ে যায় না। ওই সময়টি কীভাবে কাটবে, সেটিও ভেবে রাখুন।
একটি ছোট রুটিন হতে পারে: খেলনা গোছানো, হাত-মুখ ধোয়া, পোশাক বদলানো, তারপর পছন্দের বই থেকে গল্প শোনা।
শিশুকে দু’টি বই দেখিয়ে জিজ্ঞেস করতে পারেন, “আজ কোন গল্পটা শুনবে?” এতে শোওয়ার প্রস্তুতিতে তারও অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকে।
মোবাইল ছাড়া কী দিয়ে ব্যস্ত রাখবেন?
দামি খেলনা বা প্রতিদিন নতুন অ্যাক্টিভিটি কিটের প্রয়োজন নেই। শিশুর বয়স ও আগ্রহ অনুযায়ী সাধারণ কিছু খেলা বেছে নিতে পারেন।
| খেলা | সহজ উপায় |
| প্রাণী চেনা | পালা করে প্রাণীর ডাক করুন |
| ছবির গল্প | বইয়ের ছবি দেখে নিজের মতো গল্প বানান |
| রং খোঁজা | ঘরের লাল বা হলুদ জিনিস খুঁজুন |
| অভিনয় | পুতুলের জন্মদিন বা ছোট দোকান সাজান |
| তৈরির খেলা | বড় ব্লক দিয়ে বাড়ি বানান |
| প্রকৃতি দেখা | হাঁটার সময় গাছ, পাতা ও পাখি দেখুন |
UNICEF-ও প্রাণীর ডাক চেনা, কল্পনার খেলা, প্রকৃতি দেখা ও একসঙ্গে গল্প তৈরির মতো স্ক্রিনবিহীন কাজের উদাহরণ দিয়েছে।
বয়সোপযোগী নিরাপদ উপকরণ বেছে নিন। বিশেষ করে ছোট শিশুর ক্ষেত্রে গিলে ফেলার মতো ছোট অংশ এড়িয়ে চলুন। প্রতিটি খেলাকে পড়াশোনায় পরিণত করবেন না—আনন্দ করাটাও যথেষ্ট।
শিশুর হাতে শুধু স্ক্রিন নয়, সময়ও দিন
শিশুর স্ক্রিন টাইম দিনে এক ঘণ্টার মধ্যে রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমা। কিন্তু আসল প্রশ্ন হল, দিনের বাকি সময়টা সে কীভাবে কাটাচ্ছে। খেলছে তো? প্রশ্ন করছে? নিজের গল্প বলছে? পর্যাপ্ত ঘুম আর আপনার মনোযোগ পাচ্ছে তো?
ব্যস্ত জীবনে প্রতিদিন সব নিয়ম মানা সম্ভব না-ও হতে পারে। তাই অপরাধবোধে না ভুগে ছোট পরিবর্তন দিয়ে শুরু করুন। খাবারের সময় ফোন সরিয়ে রাখুন, ঘুমের আগে গল্প পড়ুন, শিশুর কথার উত্তর দিতে একটু থামুন। পরিবারের সবাই মিলে এই অভ্যাসগুলি ধরে রাখুন।
মনে রাখবেন, শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য আপনার নিখুঁত হওয়ার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন নিয়মিত সঙ্গ, কথা বলার সুযোগ এবং নিরাপদে খেলতে পারার স্বাধীনতা। আজ সে যে প্রশ্নটি করছে, যে ছবিটি দেখাতে চাইছে, যে গল্পটি বলতে চাইছে—সেখানেই তাকে সময় দিন। স্ক্রিন বন্ধ করার পর সেই সময়টুকু ভালোবাসা ও মনোযোগে ভরে উঠুক।


