“মা, দেখো আমি কী এঁকেছি!”
ধরুন, শিশুটি খাতা নিয়ে আপনার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ফোনে চোখ রেখেই আপনি বললেন, “বাহ্, সুন্দর!” সে চলে গেল। ছবিটা আর দেখা হল না।
এমন মুহূর্ত আমাদের ব্যস্ত জীবনে ঘটতেই পারে। কিন্তু শিশুর স্ক্রিনের সময় গুনতে গিয়ে নিজের মনোযোগের কথাও ভাবা দরকার। আমরা চাই সে মোবাইল ছেড়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলুক। সে কথা বলতে এলে আমরা কতটা শুনছি?
শিশুর মোবাইল ব্যবহার কমানোর একটি বাস্তবসম্মত শুরু হলো তার দিনে কথাবার্তা, খেলা এবং মন দিয়ে সঙ্গ দেওয়ার সুযোগ বাড়ানো। ফোন সরিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সেই সময়ে সে কী করবে, সেটিও ঠিক করতে হবে।
স্নেহ মানে শিশুর ছোট্ট কথাটিকেও গুরুত্ব দেওয়া
সন্তানের জন্য ভাল খাবার, স্কুল, বই ও জামাকাপড়ের ব্যবস্থা করতে বাবা-মায়ের পরিশ্রম কম নয়। সেই যত্নের পাশাপাশি শিশুর দরকার এমন একজন মানুষ, যাঁর কাছে তার প্রশ্ন, ভয় আর আনন্দের দাম আছে।
সে পাখি দেখিয়ে আঙুল তুললে বলুন, “ওটা পাখি। কোথায় যাচ্ছে দেখো!” ছবির বইয়ে হাত রাখলে একটু অপেক্ষা করুন—সে কী দেখাতে চাইছে? একই প্রশ্ন আবার করলে বিরক্ত হওয়ার আগে ভাবুন, সে হয়তো আপনার সঙ্গে কথাটা চালিয়ে যেতে চাইছে।
হার্ভার্ডের Center on the Developing Child-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শিশু এবং যত্নশীল বড়দের এই পাল্টাপাল্টি সাড়া—“serve and return”—মস্তিষ্কের বিকাশ এবং ভাষা ও সামাজিক দক্ষতার ভিত গড়তে সাহায্য করে।
প্রতিটি কথোপকথনকে পড়াশোনার ক্লাস বানানোর দরকার নেই। শিশুর কথা শুনুন, তার আগ্রহে সাড়া দিন। কখনও তার বানানো অদ্ভুত গল্পটিও মন দিয়ে শুনুন।
ভিডিওতে শব্দ চেনা আর কথোপকথন শেখা আলাদা
কোনও শিশু ভিডিও দেখে রং বা সংখ্যা বলতে পারছে—এটি শেখার একটি দিক। কিন্তু কথা বলা মানে শুধু শব্দ মুখস্থ করা নয়। অন্যের কথা বোঝা, নিজের প্রয়োজন জানানো এবং পালা করে কথোপকথন চালানোও তার মধ্যে পড়ে।
শিশু “বল” বললে আপনি বলতে পারেন, “হ্যাঁ, লাল বল। আমাকে দেবে?” এখানে শব্দটি একটি কাজ ও সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। শুধু প্রশ্ন করে পরীক্ষা নেওয়ার বদলে তার কথাকে একটু বড় করে ফিরিয়ে দিন।
Canadian Paediatric Society-এর পর্যালোচনায় বেশি স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে দুর্বল ভাষাদক্ষতার সম্পর্ক পাওয়ার কথা আছে। তবে সম্পর্ক পাওয়া মানেই প্রত্যেক শিশুর ভাষাগত সমস্যার একমাত্র কারণ স্ক্রিন, এমন নয়।
তাই ভিডিওতে অনেক শব্দ বলতে পারছে দেখেই নিশ্চিন্ত হবেন না। দৈনন্দিন জীবনে সে কীভাবে বোঝে, কথা বলে এবং অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে, সেটিও দেখুন।
স্ক্রিনের জন্য শিশুর দিন থেকে কী বাদ পড়ছে?
মোবাইল দেখলে অনেক শিশু চুপ করে বসে থাকে। তখন রান্না শেষ করা বা কাজের ফোন ধরা সহজ হয়। কিন্তু অভ্যাসটি বুঝতে শুধু কতক্ষণ দেখছে, সেই হিসাব যথেষ্ট নয়।
খেয়াল করুন, ভিডিও দেখতে গিয়ে তার ঘুম পিছিয়ে যাচ্ছে কি না। খেলা শুরু করেও ফোন চাইছে কি না। পরিবারের সঙ্গে কথা বলা বা বই দেখার সময় কমছে কি না।

আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্সের বর্তমান নির্দেশনায় স্ক্রিন ব্যবহারের মান, পরিস্থিতি এবং কথাবার্তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল বিনোদন যেন ঘুম, খেলা ও পরিবারের সময় দখল না করে, সেটিও দেখার বিষয়।
ছোটদের জন্য সময়ের একটি নির্দিষ্ট সীমাও আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের নির্দেশনা অনুযায়ী:
| বয়স | বসে স্ক্রিন দেখার নির্দেশনা |
| এক বছরের কম | স্ক্রিন টাইম সুপারিশ করা হয় না |
| এক বছর থেকে দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগে | বসে স্ক্রিন দেখার সময় সুপারিশ করা হয় না |
| দুই বছর থেকে পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে | দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা; কম হলে আরও ভাল |
মোবাইলের সঙ্গে টিভি ও ট্যাবে বসে বিনোদন দেখার সময়ও হিসাব করুন। এক ঘণ্টা একটি ঊর্ধ্বসীমা, প্রতিদিন পূরণ করার লক্ষ্য নয়।
পাঁচ বছর বা তার বেশি বয়সের জন্য এই সারণি প্রয়োগ করবেন না। বয়স, পড়াশোনা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ম ঠিক করুন।
সময়ের হিসাবের সঙ্গে পাঁচটি প্রশ্ন
AAP-এর “5 Cs” পদ্ধতি পরিবারের স্ক্রিনের অভ্যাস বুঝতে সাহায্য করে।
| বিষয় | নিজের কাছে প্রশ্ন |
| Child — শিশু | আমার শিশুর বয়স, স্বভাব ও প্রয়োজন কী? |
| Content — কনটেন্ট | সে কী দেখছে; সেটি তার জন্য উপযুক্ত কি? |
| Calm — শান্ত হওয়া | মন খারাপ হলেই কি ফোন দরকার হচ্ছে? |
| Crowding Out — অন্য কাজ সরে যাওয়া | স্ক্রিনের জন্য কোন দরকারি কাজ কমছে? |
| Communication — কথাবার্তা | আমরা দেখা বিষয় ও ব্যবহারের নিয়ম নিয়ে কথা বলছি কি? |
একই সময়ের স্ক্রিন ব্যবহারও আলাদা অভিজ্ঞতা হতে পারে। বড়দের সঙ্গে আলোচনা করে একটি গল্প দেখা এবং একা একের পর এক ভিডিও চালিয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি এক নয়।
ঘুম এবং নড়াচড়ার সময় আগে রাখুন
রাতের ভিডিও দেখতে দেখতে শোবার সময় পিছিয়ে গেলে শুধু স্ক্রিনের হিসাব কমানো যথেষ্ট নয়। কখন ঘুমোবে, কখন উঠবে এবং দিনের ঘুম আছে কি না—সব মিলিয়ে রুটিন দেখুন।
American Academy of Sleep Medicine-এর নির্দেশনা অনুযায়ী:
| বয়স | ২৪ ঘণ্টায় মোট ঘুম |
| ১–২ বছর | ১১–১৪ ঘণ্টা, দিনের ঘুমসহ |
| ৩–৫ বছর | ১০–১৩ ঘণ্টা, দিনের ঘুমসহ |
| ৬–১২ বছর | ৯–১২ ঘণ্টা |
ঘুমের আগে ভিডিওর বদলে শান্ত রুটিন রাখুন—হাত-মুখ ধোয়া, দাঁত মাজা, বই দেখা, তারপর শোয়া। ফোন ও ট্যাব শোবার জায়গা থেকে সরিয়ে রাখুন। শুধু ফোন বন্ধ করলেই ঘুমের সব সমস্যা মিটবে, এমন ধরে নেবেন না।
নড়াচড়ার ক্ষেত্রেও শুধু বিকেলের খেলা নয়, পুরো দিনের সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ। WHO অনুযায়ী ১–৪ বছরের শিশুদের দিনে অন্তত ১৮০ মিনিট বিভিন্ন ধরনের শারীরিক কাজে সক্রিয় থাকা দরকার। ৩–৪ বছরের ক্ষেত্রে তার মধ্যে অন্তত ৬০ মিনিট মাঝারি থেকে বেশি তীব্রতার কার্যকলাপ হওয়া উচিত।
এটি একটানা তিন ঘণ্টা ব্যায়াম নয়। দিনের মধ্যে হাঁটা, নাচ, ছোটাছুটি ও সক্রিয় খেলা মিলিয়ে সময়টি তৈরি হয়।
বাবা-মা ব্যস্ত থাকলে কী করবেন?
“সময় দিন” বলা সহজ। কিন্তু মা-বাবা দুজনেই কাজে গেলে, বাড়ির কাজ জমে থাকলে বা শিশুকে একাই সামলাতে হলে কথাটি যথেষ্ট সাহায্য করে না। তখন পুরো দিনের রুটিন বদলানোর বদলে কয়েকটি নির্দিষ্ট সুযোগ খুঁজুন।
সকালে জামা পরাতে পরাতে তার সঙ্গে কথা বলুন। বাড়ি ফিরে সম্ভব হলে ফোন সরিয়ে কিছুক্ষণ সে কী করছে দেখুন। রাতে ছোট একটি গল্প পড়ুন। এমন অভ্যাস বেছে নিন, যা বেশির ভাগ দিন ধরে রাখা সম্ভব।
দাদু-দিদা বা অন্য কেউ শিশুকে দেখাশোনা করলে তাঁদের সঙ্গেও নিয়মটি ঠিক করুন। “মোবাইল দেবেন না” বলেই দায় শেষ করবেন না। বই, খেলার জিনিস এবং বিকল্প কাজ প্রস্তুত রাখুন। পরিচর্যার দায় পরিবারের মধ্যে ভাগ করুন।
বাড়ির বাইরে নিরাপদ খেলার জায়গা না থাকলে ঘরেও কিছু করা যায়। নরম বল গড়ানো, বড় ব্লক সাজানো, কাগজে আঁকা, গান চালিয়ে নাচা বা দোকানদার-ক্রেতার অভিনয়—সব সময় দামি খেলনার দরকার হয় না।
শিশুর বয়স অনুযায়ী নিরাপদ জিনিস ব্যবহার করুন। ছোট শিশুকে মুখে ঢোকাতে পারে এমন ছোট অংশ দেবেন না। আবার সারাক্ষণ তাকে খেলিয়ে যেতেও হবে না। নিরাপদ পরিবেশে বড়দের নজরের মধ্যে নিজের মতো খেলার সুযোগ রাখুন।
বয়স অনুযায়ী বিকল্প খেলা বেছে নিন
সব শিশুকে একই কাজ দিয়ে ব্যস্ত রাখা যায় না। নিচের উদাহরণগুলি নিজের শিশুর আগ্রহ ও সক্ষমতা অনুযায়ী বদলে নিন।
| বয়স | স্ক্রিন ছাড়া চেষ্টা করতে পারেন |
| ২ বছরের কম | মুখোমুখি কথা, টুকি খেলা, গান, নিরাপদ মেঝেতে বয়স উপযোগী খেলা |
| ২–৩ বছর | বড় ব্লক, ছবির বই, পুতুলকে খাওয়ানোর অভিনয়, নরম বল গড়ানো |
| ৩–৫ বছর | আঁকা, সহজ পাজল, দোকানদার খেলা, গল্পের চরিত্র অভিনয় |
| স্কুলপড়ুয়া | বোর্ড গেম, হাতের কাজ, বই, খেলাধুলা, বয়স উপযোগী ঘরের কাজে অংশ নেওয়া |
একটি ঝুড়িতে কয়েকটি নিরাপদ খেলার জিনিস রাখুন। সব একসঙ্গে না দিয়ে পালা করে ব্যবহার করতে পারেন। কী আঁকবে বা কী বানাবে, প্রতিবার বড়রা ঠিক করে দেবেন না; তার নিজের ধারণাকেও জায়গা দিন।
ফোন বন্ধ করলে কান্না: সেই মুহূর্তে কী বলবেন?
শিশু দীর্ঘদিন খাওয়ার সময় ভিডিও দেখে থাকলে হঠাৎ বন্ধ করায় আপত্তি করতে পারে। তখন বকাঝকা না করে আগে থেকেই পরিবর্তনের কথা জানান।
বলতে পারেন, “এই ভিডিওটা শেষ হলে ফোন রাখব। তারপর তুমি ঠিক করবে—বই দেখবে, না আঁকবে?”
বন্ধ করার পরে কান্না শুরু হলে শান্তভাবে বলুন, “তুমি আরও দেখতে চাইছ, বুঝতে পারছি। আজ দেখা শেষ। আমি তোমার পাশে আছি।”
সঙ্গে সঙ্গে খেলায় মন না বসলে একটু সময় দিন। আদর চাইলে আদর করুন। একই কথা নিয়ে দীর্ঘ তর্কে যাবেন না।
এগুলি চেষ্টা করার ব্যবহারিক উপায়; সব শিশু একইভাবে সাড়া দেবে না। কান্না হলে তার খিদে, ক্লান্তি বা অন্য অস্বস্তিও দেখুন। ফোনই যেন শান্ত করার একমাত্র উপায় না হয়ে ওঠে—AAP-এর “5 Cs” নির্দেশনাতেও এই বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
বাড়ির বড়দের নিয়মে মিল থাকাও জরুরি। একজন বন্ধ করার পরে আরেকজন চালিয়ে দিলে শিশুর পক্ষে সীমাটি বোঝা কঠিন হয়।
খাওয়ার সময় একটি পরিবর্তন দিয়ে শুরু করুন
একসঙ্গে সব অভ্যাস বদলানো কঠিন মনে হলে দিনের একটি খাবার বেছে নিন। সেই সময় শিশুর সঙ্গে বড়রাও ফোন সরিয়ে রাখবেন।
বয়স অনুযায়ী তাকে নিজে খেতে দিন। খাবার নিয়ে সহজ কথা বলুন, কিন্তু প্রতিটি গ্রাস খাওয়ানোর জন্য বিনোদন বা পুরস্কারের ব্যবস্থা করবেন না। ভিডিও বন্ধ হয়েছে বলে জোর করে বেশি খাওয়াবেন না।
প্রথম কয়েক দিন পরিকল্পনা মতো না-ও চলতে পারে। একটি কঠিন দিন মানেই চেষ্টা ব্যর্থ নয়। কী সমস্যা হচ্ছে দেখে রুটিন সামান্য বদলান।
খাওয়া নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, গিলতে অসুবিধা বা ওজন নিয়ে উদ্বেগ থাকলে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
বড়দের কাজের ফোন আর অবসরের ফোন আলাদা করে বোঝান
অনেকের কাজই ফোনে। তাই শিশুর সামনে কখনও ফোন ব্যবহার করবেন না—এমন নিয়ম বাস্তবসম্মত নয়।
কাজের কল এলে বলুন, “আমাকে কাজের কথা বলতে হবে। শেষ হলে তোমার ছবিটা দেখব।” তারপর কল শেষ করে ফিরে আসুন। কাজ শেষ হওয়ার পরে উদ্দেশ্য ছাড়া স্ক্রল করার সময় কমাতে পারেন।
খাওয়ার সময় এবং ঘুমের আগের এক ঘণ্টা পরিবারের স্ক্রিনমুক্ত রাখার চেষ্টা করুন। বড়দের নিজের ব্যবহারে দৃষ্টান্ত রাখার পরামর্শও AAP দিয়েছে।
শিশুকে অপেক্ষা করতে শেখানো দরকার। তবে তাকে অপেক্ষা করিয়ে বারবার ভুলে যাবেন না। যে সময় দেওয়ার কথা বলেছেন, সম্ভব হলে সেটি রাখুন।
ঘরে টিভি চললে সেটিও খেয়াল করুন
শিশু ফোন দেখছে না, কিন্তু পাশে টিভি সারাক্ষণ চলছে—এই পরিস্থিতিও গুরুত্ব পায়। Canadian Paediatric Society-এর পর্যালোচনায় ব্যাকগ্রাউন্ড টিভি শিশুর খেলা ও বড়দের সঙ্গে যোগাযোগে বাধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
কেউ দেখছে না এমন টিভি বন্ধ রাখুন। শিশুর সঙ্গে বই পড়া বা কথা বলার সময় পাশে অন্য ভিডিও চলতে দেবেন না। গান শুনতে চাইলে ছবি চালু না রেখেও শোনা যায়।
শিক্ষামূলক ভিডিও দেখালে কী খেয়াল রাখবেন?
বয়স উপযোগী ভাল কনটেন্ট শেখার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে “শিক্ষামূলক” লেখা থাকলেই ভিডিওটি উপযুক্ত, এমন ধরে নেবেন না।
দেখার সময় পাশে থাকুন। পরে সেটিকে বাস্তব কাজে নিয়ে আসুন—রঙের ভিডিও দেখলে খাতায় রং করুন, পাখি দেখলে জানালার বাইরে খুঁজুন।
বাস্তব মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ছোট শিশুর শেখায় গুরুত্বপূর্ণ। ভিডিওকে কথা বলা, বই পড়া ও খেলার বিকল্প করবেন না।
কনটেন্ট বাছার সময় কী দেখবেন?
সম্ভব হলে ভিডিওটি আগে নিজে দেখুন। গল্পটি বয়স উপযোগী কি না, ভয়ের দৃশ্য বা অনুপযুক্ত আচরণ আছে কি না, অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন রয়েছে কি না দেখুন।
অটোপ্লে বন্ধ রাখুন এবং দেখার জন্য আগে থেকে নির্দিষ্ট কনটেন্ট বেছে নিন। AAP-এর ডিজিটাল পরিবেশ বিষয়ক প্রতিবেদনে অন্তহীন স্ক্রল ও অটোপ্লে ব্যবহারের সময় বাড়ানোর বিষয়টি উঠে এসেছে।
শিশুর পছন্দকে গুরুত্ব দিন, তবে কী দেখা যাবে সেই সিদ্ধান্ত বড়দের তত্ত্বাবধানে থাকুক।
প্যারেন্টাল কন্ট্রোল সহায়ক হতে পারে, কিন্তু সেটি চালু করেই নিশ্চিন্ত হয়ে যাবেন না। কী দেখা হচ্ছে তা জানার এবং শিশুর সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন থাকবেই।
ভিডিও কল কি কার্টুন দেখার মতো?
দূরে থাকা বাবা, মা বা আত্মীয়ের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলা একা বসে কার্টুন দেখার থেকে আলাদা। অন্য মানুষটি শিশুর কথা ও অঙ্গভঙ্গিতে সাড়া দিতে পারেন।
AAP-এর ব্যাখ্যায় বড়দের সহায়তায় এমন ভিডিও কল পারিবারিক সম্পর্ক বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।
পাশে বসে কথা এগিয়ে দিন—“দিদাকে তোমার খেলনাটা দেখাবে?” শিশু আগ্রহ হারালে কল দীর্ঘ করবেন না। এই ব্যতিক্রমকে একা ভিডিও দেখানোর অনুমতি হিসেবে ধরবেন না।
কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য দরকার?
শিশুর কথা বলা, বোঝা, ঘুম বা আচরণ নিয়ে উদ্বেগ থাকলে শুধু মোবাইলকে কারণ ধরে বসে থাকবেন না। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলুন। আগে শেখা দক্ষতা হারিয়ে গেলে দ্রুত মূল্যায়ন করানো দরকার।
CDC-ও বিকাশ নিয়ে উদ্বেগ বা আগে শেখা দক্ষতা হারিয়ে গেলে অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেয়।
ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগে উদাহরণ লিখে রাখুন: কী নিয়ে উদ্বেগ, কখন থেকে হচ্ছে, শিশুর ঘুম ও খাওয়া কেমন, দিনে কী দেখে এবং অন্যদের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করে। প্রয়োজনে শিক্ষক বা পরিচর্যাকারীর পর্যবেক্ষণও জানান।
কোনও শিশু যোগাযোগের সহায়ক প্রযুক্তি বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শে ডিজিটাল সহায়তা ব্যবহার করলে সেটিকে বিনোদনের স্ক্রিনের সঙ্গে এক করে হঠাৎ বন্ধ করবেন না। তার প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা করুন।
পরিবারের পরিবর্তনটি কীভাবে ধরে রাখবেন?
কয়েক দিন একটি ছোট খাতায় লিখতে পারেন: কখন স্ক্রিন চালু হল, কেন দেওয়া হল, কতক্ষণ চলল এবং তার বদলে কী করা যেত। এটি শিশুকে নম্বর দেওয়ার খাতা নয়; বড়দের অভ্যাস বোঝার উপায়।
যদি দেখেন রান্নার সময়ই প্রতিদিন ফোন দিতে হচ্ছে, আগে থেকে ওই সময়ের খেলা প্রস্তুত করুন। যদি ঘুমের আগে বেশি দেখছে, রাতের রুটিনে কাজ করুন। একসঙ্গে সব বদলানোর বদলে যে পরিস্থিতিটি বারবার হচ্ছে, সেটি দিয়ে শুরু করুন।
পরিবারের নিয়ম সহজ রাখুন:
- খাওয়ার সময় ফোন থাকবে না।
- দেখা শেষ হলে কোথায় রাখা হবে, তা ঠিক থাকবে।
- বড়রা যে সময় দেওয়ার কথা বলবেন, তা রাখার চেষ্টা করবেন।
স্কুলে পড়াশোনার কাজে স্ক্রিন ব্যবহার হলে সেই ব্যবহারের কথাও জেনে নিন, যাতে বাড়ির পরিকল্পনা পুরো দিনটিকে ধরে হয়।
শিশু নিজে ফোন রেখে খেলতে গেলে কাজটির স্বীকৃতি দিন—“তুমি ফোন রেখে ব্লক সাজাতে শুরু করেছ, দেখলাম।” পরিবর্তন শুধু কী বন্ধ হল, তা নিয়ে নয়; কী ফিরে এল, সেটিও লক্ষ করুন।
আজ থেকেই একটি ছোট শুরু
আজ একটি খাবারের সময় বাড়ির সবাই ফোন সরিয়ে রাখুন। শিশুকে প্রশ্ন করুন, তার উত্তর শুনুন। সে খাতা নিয়ে এলে ছবিটা সত্যিই দেখুন।
মোবাইলের সময় কমানোর অগ্রগতি শুধু মিনিটে মাপবেন না। দেখুন, শিশুর দিনে খেলা ফিরছে কি না, আপনাদের কথাবার্তা বাড়ছে কি না, ঘুমের রুটিন সহজ হচ্ছে কি না।
স্নেহে বড় করা মানে সব আবদার মেনে নেওয়া নয়। আদরের সঙ্গে ধৈর্য, সীমা এবং কথা রাখার অভ্যাসও থাকে।
শিশুর হাতে ফোন দেওয়ার আগে একবার নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিন।


