স্কুলের প্রথম দিনের ছবিতে শিশুটি হাসছে। ইউনিফর্মে স্কুলের নাম দেখা যাচ্ছে, পেছনে প্রতিষ্ঠানের ফটক। ছবিটি হয়তো পরিবারের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার জন্যই তোলা। কিন্তু অনলাইনে প্রকাশের পর সেটি দেখে অপরিচিত কেউও জেনে যেতে পারেন, শিশুটি কোথায় পড়ে।
জন্মদিন, বেড়াতে যাওয়া কিংবা পরিবারের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তের ছবিতেও এমন তথ্য থেকে যেতে পারে। কখনো ছবির পেছনে বাড়ির নম্বর দেখা যায়, কখনো ক্যাপশনে লেখা থাকে কোথায় যাওয়া হয়েছে। ছবি প্রকাশের সময় এসব বিষয় অনেকের নজর এড়িয়ে যায়।
Child photo privacy বা শিশুর ছবির ডিজিটাল গোপনীয়তা রক্ষার শুরু এখান থেকেই। ছবিতে কী দেখা যাচ্ছে, তার সঙ্গে কী তথ্য যুক্ত হচ্ছে এবং সেটি কারা দেখতে পাবেন, তা আগে বুঝে নেওয়া দরকার। সব ছবি প্রকাশ করা বিপজ্জনক নয়। তবে প্রাইভেসি সেটিংস চালু থাকলেই নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই। যাঁদের সঙ্গে ছবি শেয়ার করা হচ্ছে, তাঁদের কেউ সেটি সংরক্ষণ বা অন্যত্র পাঠাতে পারেন। ফলে ছবি পোস্ট করার সিদ্ধান্তটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুর একটি ছবি কতটা তথ্য প্রকাশ করতে পারে?
অভিভাবকেরা যখন সন্তানের ছবি, ভিডিও বা ব্যক্তিগত জীবনের তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করেন, সেই অভ্যাসকে বলা হয় Sharenting। শব্দটি এসেছে Sharing ও Parenting থেকে। সন্তানের ভালো মুহূর্ত অন্যদের দেখানোর ইচ্ছায় সমস্যা নেই। উদ্বেগ তৈরি হয় তখন, যখন শিশুর পরিচয় বা ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে এমন তথ্য প্রকাশিত হয়, যার ওপর পরে আর নিয়ন্ত্রণ রাখা যায় না।
ধরা যাক, একদিন শিশুর স্কুলের ছবি প্রকাশ করা হলো। অন্যদিন বাড়ির কাছের খেলার মাঠে তোলা ছবি। কয়েক দিন পর স্কুলে যাওয়ার সময় বা নিয়মিত কোথাও যাওয়ার কথা ক্যাপশনে লেখা হলো।
প্রতিটি পোস্ট আলাদাভাবে তেমন কিছু প্রকাশ না করলেও একসঙ্গে দেখলে শিশুর চলাফেরা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। এখানে ছবির সঙ্গে থাকা তথ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্কুলের নাম, বাড়ির আশপাশের পরিচিত স্থাপনা, রাস্তার চিহ্ন কিংবা নির্দিষ্ট সময়ে কোথায় যাওয়া হচ্ছে, এসব তথ্য অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রকাশ করা ঠিক নয়।
ছবির ব্যবহার আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে
প্রকাশ করা ছবি অন্য কেউ ডাউনলোড করতে পারেন, স্ক্রিনশট নিতে পারেন কিংবা নতুন পোস্টে ব্যবহার করতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে ছবির অপব্যবহার করে ভুয়া অ্যাকাউন্ট বা অপমানজনক কনটেন্টও তৈরি করা সম্ভব।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে ছবি পরিবর্তন বা নকল দৃশ্য তৈরির সুযোগ এই উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এ ধরনের বিভ্রান্তিকর বা ক্ষতিকর ছবি তৈরিতে ডিপফেক প্রযুক্তির ব্যবহারও একটি সম্ভাব্য ঝুঁকি। তার মানে এই নয় যে অনলাইনে থাকা প্রত্যেক শিশুর ছবিই অপব্যবহারের শিকার হবে। কিন্তু একবার ছবি অন্যের হাতে চলে গেলে সেটি কীভাবে ব্যবহার হবে, তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
আরেকটি বিষয় প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। শিশুটি নিজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার শুরুর আগেই তার বহু ছবি অনলাইনে জমা হতে পারে। বড় হওয়ার পর সে হয়তো সেসব ছবি প্রকাশ্যে রাখতে চাইবে না। এই ব্যক্তিগত ইতিহাসই তার ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টের অংশ হয়ে যায়।
সব সুন্দর মুহূর্ত প্রকাশ করার নয়

ছবিটি পারিবারিক স্মৃতি হিসেবে মূল্যবান হতে পারে। কিন্তু সেটি প্রকাশ করা শিশুর জন্য উপযুক্ত কি না, তা আলাদা করে ভাবা দরকার। গোসলের সময়, পোশাক পরিবর্তনের মুহূর্ত কিংবা শরীরের ব্যক্তিগত অংশ দৃশ্যমান এমন ছবি অনলাইনে দেওয়া উচিত নয়। একই সতর্কতা প্রযোজ্য অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসা নেওয়া, কান্নাকাটি বা শিশুর ব্যক্তিগত কষ্টের মুহূর্তের ক্ষেত্রেও।
অনেক সময় অভিভাবকের কাছে মজার মনে হওয়া ছবিও শিশুর জন্য বিব্রতকর হতে পারে। শিশুর বয়স এমন হলে যে নিজের মতামত জানাতে পারে, ছবি পোস্ট করার আগে তাকে জিজ্ঞেস করুন। সে ছবি প্রকাশ করতে না চাইলে সেই সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিন।
অবশ্য ছোট শিশু সম্মতি দিলেই সেটিকে অনলাইনে প্রকাশের ঝুঁকি বোঝার ক্ষমতা হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। শেষ পর্যন্ত ছবিটি প্রকাশের উপযুক্ত কি না, তা অভিভাবককেই বিচার করতে হবে।
অন্য শিশুর ছবি থাকলে?
স্কুলের অনুষ্ঠান বা জন্মদিনের ছবিতে নিজের সন্তানের পাশাপাশি অন্য শিশুও থাকতে পারে। নিজের সন্তানের ছবি প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলেও অন্য শিশুর ক্ষেত্রে তার অভিভাবকের অনুমতি নেওয়া উচিত।
অনুমতি না পেলে ছবির সেই অংশ বাদ দেওয়া যায়। স্কুল বা কোচিং প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানেও ছবি তোলা এবং প্রকাশের নিজস্ব নিয়ম থাকতে পারে। সেগুলোও মানতে হবে।
ছবি পোস্ট করার আগে এই বিষয়গুলো মিলিয়ে নিন
প্রতিবার দীর্ঘ প্রাইভেসি সেটিংস ঘাঁটাঘাঁটি করার দরকার নেই। ছবি প্রকাশের আগে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই অনেক অনিচ্ছাকৃত ভুল ধরা পড়তে পারে।
- ছবিটি প্রকাশ করা জরুরি? শুধু পরিবারের কাউকে দেখাতে চাইলে প্রকাশ্য পোস্টের বদলে ব্যক্তিগতভাবে পাঠানো যায় কি না, ভাবুন।
- শিশুটি স্বচ্ছন্দ? ছবিটি তার কাছে বিব্রতকর হতে পারে কি না এবং মতামত জানানোর মতো বয়স হলে সে কী চাইছে, দেখুন।
- পরিচয় প্রকাশ পাচ্ছে? ইউনিফর্ম, স্কুলের লোগো, পরিচয়পত্র, পুরো নাম বা জন্মতারিখ দৃশ্যমান আছে কি না, পরীক্ষা করুন।
- অবস্থান বোঝা যাচ্ছে? বাড়ির নম্বর, রাস্তার নাম, পরিচিত স্থাপনা কিংবা কোথায় যাওয়া হয়েছে, এমন তথ্য ছবিতে বা ক্যাপশনে আছে কি না, দেখুন।
- পেছনের অংশ পরীক্ষা করেছেন? দেয়ালে ঝোলানো নথি, ক্যালেন্ডারে লেখা তথ্য, গাড়ির নম্বরপ্লেট বা আয়নার প্রতিফলনও দেখে নিন।
- ছবিতে অন্য শিশু আছে? থাকলে তাদের অভিভাবকের অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না, নিশ্চিত করুন।
- কারা ছবিটি দেখতে পাবে? পোস্টের দর্শক, লোকেশন তথ্য এবং অন্য প্ল্যাটফর্মে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেয়ার হওয়ার সেটিংস যাচাই করুন।
প্রয়োজনে ছবি ক্রপ করে স্কুলের লোগো বা ব্যক্তিগত তথ্য বাদ দিন। তবে কিছু অংশ ঢেকে দিলেই ছবিটি পুরোপুরি নিরাপদ হয়ে যায় না। আশপাশের পরিবেশ থেকেও শিশুর পরিচয় বা অবস্থান বোঝা যেতে পারে।
বিশেষ করে বেড়াতে যাওয়ার ছবি প্রকাশের সময় একটু সতর্ক থাকা ভালো। কোথায় আছেন, কখন বের হয়েছেন বা কোথায় যাচ্ছেন, তাৎক্ষণিকভাবে এসব তথ্য জানানোর প্রয়োজন নেই। ফিরে এসে ছবি প্রকাশ করা তুলনামূলক সতর্ক সিদ্ধান্ত হতে পারে। তখনো অবশ্য ছবি ও ক্যাপশন পরীক্ষা করা দরকার।
Facebook ও Instagram প্রাইভেট রাখলেই কি যথেষ্ট?
প্রাইভেসি সেটিংস ছবির দর্শক সীমিত করতে সাহায্য করে। তবে সেটিংস ঠিক করার আগে নিজের বন্ধু ও ফলোয়ারদের তালিকা দেখে নেওয়া দরকার। সেখানে অপরিচিত মানুষ থাকলে সীমিত দর্শকের পোস্টও তাঁদের কাছে পৌঁছাতে পারে।
Facebook-এ যা পরিবর্তন করবেন
নতুন পোস্ট তৈরির সময় নিজের নামের কাছে থাকা Audience Selector থেকে কারা পোস্টটি দেখতে পাবেন, তা নির্বাচন করা যায়। Public-এর বদলে Friends অথবা উপযুক্ত সীমিত দর্শকের তালিকা বেছে নিতে পারেন। পোস্ট প্রকাশের আগে নির্বাচিত অপশনটি আরেকবার পরীক্ষা করুন।
পুরোনো পোস্টের গোপনীয়তা দেখতে Facebook-এর Settings & privacy → Settings → Audience and visibility অংশে যান। Privacy Checkup থেকেও বিভিন্ন গোপনীয়তা সেটিংস পর্যালোচনা করা যায়।
একটি সীমাবদ্ধতা মাথায় রাখুন। Facebook-এর বর্তমান প্রোফাইল ছবি ও কভার ছবি সাধারণভাবে প্রকাশ্য থাকে। তাই শিশুর পরিচয় প্রকাশ করে এমন ছবি এসব স্থানে ব্যবহার না করাই ভালো।
Instagram-এ কারা আপনার ছবি দেখছে?
Instagram-এর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট Private করা যায়। সাধারণভাবে প্রোফাইলের মেনু থেকে Settings and activity-এর Account privacy অংশে এই অপশন পাওয়া যায়। অ্যাপের সংস্করণ অনুযায়ী মেনুর অবস্থান কিছুটা বদলাতে পারে।
Private Account চালু করলে নতুন ফলোয়ারদের অনুমোদন করতে হয়। কিন্তু আগে থেকে যাঁরা ফলো করছেন, তাঁদের তালিকা অপরিবর্তিত থাকতে পারে। তাই সেই তালিকাও দেখে নিন। Instagram-এর Professional Account সরাসরি Private করা যায় না। সে ক্ষেত্রে আগে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে পরিবর্তন করতে হবে।
আরও একটি বিষয় খেয়াল করুন। Instagram-এর অ্যাকাউন্ট Private থাকলেও প্রোফাইলের কিছু তথ্য প্রকাশ্য থাকতে পারে। তাই প্রোফাইল ছবি, নাম ও পরিচিতিমূলক তথ্যেও শিশুর ব্যক্তিগত পরিচয় প্রকাশ করা এড়িয়ে চলুন। Instagram থেকে Facebook-এ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পোস্ট শেয়ার করলে দুই প্ল্যাটফর্মের দর্শক এক নাও হতে পারে। একই ছবির জন্য উভয় অ্যাকাউন্টের সেটিংস আলাদাভাবে পরীক্ষা করা দরকার।
আরও পড়ুন: গুগল অ্যাকাউন্টের প্রাইভেসি চেকআপ: কোন সেটিংস আগে বদলাবেন
ছবির সঙ্গে লোকেশনও চলে যাচ্ছে কি না, দেখুন
স্মার্টফোনে তোলা ছবির সঙ্গে অনেক সময় অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষিত থাকে। ছবির এই অতিরিক্ত তথ্যকে মেটাডেটা (Metadata) বলা হয়।
এতে ছবি তোলার সময়, তারিখ, ডিভাইসের তথ্য এবং লোকেশন থাকতে পারে। কিছু অ্যাপ এসব তথ্য শেয়ার করার সুযোগ দেয়, আবার কোনো কোনো প্ল্যাটফর্ম স্বয়ংক্রিয়ভাবে আড়াল করে। তাই একটি অ্যাপে ছবি পাঠানোর অভিজ্ঞতা দেখে অন্য অ্যাপেও একই ব্যবস্থা আছে, এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
iPhone-এ লোকেশন তথ্য বাদ দেওয়া

iPhone-এর Photos অ্যাপ থেকে ছবি শেয়ার করার সময় লোকেশন তথ্য বাদ দেওয়া যায়। ছবিটি খুলে Share নির্বাচন করুন। এরপর Options-এ গিয়ে Location বন্ধ করে Done চাপুন। তারপর ছবিটি শেয়ার করুন।
এতে ওই শেয়ারিংয়ের সময় ছবির অবস্থানসংক্রান্ত মেটাডেটা পাঠানো এড়ানো যায়। ছবির সংরক্ষিত লোকেশন সরাতে Photos অ্যাপে ছবির তথ্য খুলে Adjust Location থেকে No Location নির্বাচন করার ব্যবস্থাও রয়েছে।
ভবিষ্যতে Camera অ্যাপ যেন লোকেশন তথ্য সংরক্ষণ না করে, সে জন্য Settings → Privacy & Security → Location Services → Camera → Never নির্বাচন করা যায়।
Android-এ পদ্ধতি এক নয়
Android ফোনে Camera অ্যাপের Settings-এর মধ্যে Location tags, Save location বা কাছাকাছি নামের অপশন থাকতে পারে। সেটি বন্ধ করলে ভবিষ্যতে তোলা ছবিতে ক্যামেরার মাধ্যমে অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য যুক্ত হওয়া বন্ধ করা সম্ভব হতে পারে।
তবে Samsung, Pixel বা অন্য নির্মাতার ফোনে অপশনের নাম ও অবস্থান আলাদা হতে পারে। আগে তোলা ছবির লোকেশন সরানোর পদ্ধতিও সব ডিভাইসে এক নয়।
Google Photos-এর একটি সীমাবদ্ধতা
Google Photos-এ লোকেশন তথ্য সম্পাদনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ক্যামেরা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষিত লোকেশন Google Photos-এর মধ্যে সরাসরি পরিবর্তন বা মুছে ফেলা যায় না। তবে Google Photos নিজে অনুমান করে যোগ করা লোকেশন কিংবা ব্যবহারকারীর যোগ করা লোকেশন পরিবর্তন বা সরানো সম্ভব।
Google Photos-এ নতুন অ্যালবাম, লিংক বা কথোপকথনের মাধ্যমে ছবি শেয়ারের সময় লোকেশন সাধারণভাবে ডিফল্টভাবে শেয়ার করা হয় না। তবে সেটিংস পরিবর্তন করা যায়, আর Partner sharing-এর নিয়ম আলাদা।
ছবি পাঠানোর আগে তাই সংশ্লিষ্ট অ্যালবাম বা শেয়ারিংয়ের Location options পরীক্ষা করুন। লোকেশন মেটাডেটা সরিয়ে ফেললেও একটি বিষয় থেকে যায়। ছবিতে যদি রাস্তার নাম, পরিচিত ভবন বা স্কুলের ফটক দেখা যায়, সেখান থেকেও অবস্থান বোঝা সম্ভব।
পরিবারের সঙ্গে ছবি ভাগ করার সময়ও সতর্কতা দরকার
শিশুর ছবি সবার জন্য প্রকাশ না করে পরিবারের নির্দিষ্ট সদস্যদের সঙ্গে ভাগ করা অনেক ক্ষেত্রে বেশি যুক্তিসংগত। Google Photos-এর Shared Album ব্যবহার করে নির্বাচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি শেয়ার করা যায়। তবে লিংক শেয়ারিং চালু থাকলে লিংক পাওয়া অন্যরাও অ্যালবামে প্রবেশ করতে পারেন।
কাউকে অ্যালবাম থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরও লিংক শেয়ারিং চালু থাকলে তাঁর কাছে থাকা লিংক দিয়ে প্রবেশের সুযোগ থেকে যেতে পারে। শেয়ারড অ্যালবামের সেটিংস অনুযায়ী সদস্যরা অন্যদের যুক্ত করার সুযোগও পেতে পারেন। তাই সদস্যদের তালিকা, লিংক শেয়ারিং এবং Collaborate অপশন দেখে নেওয়া ভালো।
WhatsApp-এর ছোট পারিবারিক গ্রুপও একটি বিকল্প। তবে গ্রুপের কেউ ছবি অন্যত্র পাঠাতে পারবেন না, এমন নিশ্চয়তা নেই। আসলে এখানে প্রযুক্তির পাশাপাশি পরিবারের বোঝাপড়াও জরুরি। সন্তানের ছবি অন্য কোথাও পোস্ট করার আগে অভিভাবকের অনুমতি নিতে হবে, এমন নিয়ম আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ঠিক করে রাখা যায়। কেউ যদি ছবি প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেন, সেটিও সম্মান করা উচিত।
পুরোনো পোস্টগুলো একবার খতিয়ে দেখুন
যাঁরা অনেক দিন ধরে সন্তানের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করছেন, তাঁদের জন্য পুরোনো পোস্ট পর্যালোচনা করা ভালো শুরু হতে পারে। প্রথমে প্রকাশ্য অ্যালবাম, প্রোফাইল ছবি ও কভার ছবিগুলো দেখুন। স্কুলের নাম, ইউনিফর্ম, বাসার ঠিকানা বা ব্যক্তিগত নথি দেখা যাচ্ছে এমন ছবি আছে কি না, খুঁজে বের করুন।
গোসল, পোশাক পরিবর্তন, অসুস্থতা বা অন্য বিব্রতকর মুহূর্তের ছবিও সরিয়ে ফেলা ভালো। যেসব ছবি রাখতে চান, সেগুলোর দর্শক সীমিত করার সুযোগ আছে কি না, দেখুন। তবে কোনো ছবি মুছে ফেললেই সেটির আগে নেওয়া স্ক্রিনশট বা অন্যের ডাউনলোড করা কপি মুছে যাবে না।
আত্মীয়স্বজন বা পরিচিত কেউ শিশুর ছবি প্রকাশ করে থাকলে তাঁদেরও পোস্টগুলো পর্যালোচনা করতে বলতে পারেন।
অনুমতি ছাড়া শিশুর ছবি ছড়িয়ে পড়লে কী করবেন?
কেউ শিশুর ছবি অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করলে আগে পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা নিন। সাধারণ কোনো ছবি বা পোস্ট হলে তার ওয়েব ঠিকানা, প্রকাশকারী অ্যাকাউন্টের পরিচয় এবং ঘটনার প্রাসঙ্গিক তথ্য সংরক্ষণ করা যায়। প্রয়োজন হলে স্ক্রিনশটও রাখতে পারেন।
পরিচিত কেউ ছবি প্রকাশ করলে তাঁকে সরিয়ে নিতে বলুন। অচেনা অ্যাকাউন্ট হলে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মের Report অপশন ব্যবহার করুন। স্কুল বা কোনো প্রতিষ্ঠান ছবি প্রকাশ করলে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের ছবি প্রকাশের নীতি সম্পর্কে জানতে চান।
তবে শিশুর যৌন নির্যাতন-সংক্রান্ত বা যৌনভাবে স্পষ্ট ছবির ক্ষেত্রে সতর্কতা আলাদা। এমন ছবি প্রমাণ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে নতুন করে ডাউনলোড, সংরক্ষণ বা অন্য কাউকে পাঠানো উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরাপদ অভিযোগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
হুমকি, ব্ল্যাকমেইল বা শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা থাকলে স্থানীয় পুলিশ বা প্রাসঙ্গিক সাইবার অপরাধ সহায়তা কর্তৃপক্ষের সাহায্য নিন। ভারতে সাইবার অপরাধের অভিযোগ জানানোর জন্য সরকারি National Cyber Crime Reporting Portal রয়েছে। সেখানে নারী ও শিশুসংক্রান্ত অপরাধের জন্য পৃথক অভিযোগের ব্যবস্থা আছে।
বাংলাদেশে এমন ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট থানায় বা পুলিশের উপযুক্ত সাইবার অপরাধ তদন্ত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। অভিযোগের পদ্ধতি এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণ সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
Take It Down কখন কাজে আসতে পারে?
অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় ধারণ করা কোনো ব্যক্তির নগ্ন, আংশিক নগ্ন বা যৌনভাবে স্পষ্ট ছবি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলে National Center for Missing & Exploited Children-এর Take It Down সেবা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সহায়ক হতে পারে।
ছবিটি তোলার সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বয়স ১৮ বছরের কম হতে হবে। উপযুক্ত ছবি বা ভিডিও আগে থেকেই ডিভাইসে থাকতে হবে। এই সেবা ছবির একটি ডিজিটাল শনাক্তকরণ তথ্য বা Hash তৈরি করে। মূল ছবি NCMEC-এ আপলোড করা হয় না। অংশগ্রহণকারী প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের প্রকাশ্য বা এনক্রিপশনবিহীন সেবায় মিলে যাওয়া কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণের ব্যবস্থা নিতে পারে।
সেবাটি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও ব্যবহারযোগ্য। তবে সব ওয়েবসাইট বা এনক্রিপ্টেড মেসেজিং সেবায় কাজ করে না। এটিকে ইন্টারনেট থেকে সব কপি সরানোর নিশ্চয়তা হিসেবেও দেখা যাবে না। যে ছবি ডিভাইসে নেই, সেটি Take It Down-এ জমা দেওয়ার জন্য নতুন করে ডাউনলোড বা অন্যের কাছ থেকে সংগ্রহ করা উচিত নয়। শিশুর যৌন নির্যাতন বা এ ধরনের কনটেন্ট ছড়ানোর হুমকি থাকলে NCMEC-এর CyberTipline-এও অভিযোগ জানানো যায়।
কোনো ছবি পোস্ট না করাও একটি সিদ্ধান্ত
শিশুর মুখ ঢেকে দেওয়া, অ্যাকাউন্ট প্রাইভেট রাখা কিংবা ছবির লোকেশন সরিয়ে ফেলা—সবই কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে। কিন্তু এগুলোর কোনোটি একা ছবির গোপনীয়তা নিশ্চিত করে না। মুখ ঢাকা থাকলেও ইউনিফর্ম বা আশপাশের পরিবেশ থেকে পরিচয় বোঝা যেতে পারে। আবার প্রাইভেট অ্যাকাউন্টের কোনো দর্শক ছবি অন্যত্র পাঠাতে পারেন।
তাই শিশুর ছবি প্রকাশ করার আগে সেটি আদৌ অনলাইনে দেওয়া দরকার কি না, সেই প্রশ্নটিই আগে আসা উচিত। Child photo privacy রক্ষার জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত অভ্যাস হলো অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য প্রকাশ না করা।
শুরু করতে পারেন নিজের পুরোনো প্রকাশ্য পোস্টগুলো দেখে। এরপর পরিবারের সঙ্গে ছবি শেয়ারের নিয়ম ঠিক করুন এবং নতুন পোস্টের আগে একবার ছবি ও ক্যাপশন পরীক্ষা করুন। সন্তানের স্মৃতি সংরক্ষণ করতে হলে সেটি সবাইকে দেখাতে হবে, এমন নয়। কিছু মুহূর্ত ব্যক্তিগত থাকলে শিশুটি বড় হওয়ার পর নিজের কোন ছবি অন্যদের সঙ্গে ভাগ করবে, সে সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারবে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
১. কত বছর বয়স থেকে শিশুর ছবি পোস্ট করার আগে তার অনুমতি নেওয়া উচিত?
শিশু যখন নিজের পছন্দ-অপছন্দ প্রকাশ করতে শেখে, তখন থেকেই ছবি শেয়ার করার আগে তার মতামত জানতে চাওয়া ভালো। এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো বয়সের অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। তবে ছোট শিশু সম্মতি দিলেও অনলাইনে ছবি প্রকাশের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বুঝতে নাও পারে। তাই ছবিটি প্রকাশ করা কতটা উপযুক্ত, সেই সিদ্ধান্ত অভিভাবককেই নিতে হবে।
২. শিশুর ছবি Google Photos বা ক্লাউডে রাখলে কি তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রকাশ হয়ে যায়?
না। Google Photos-এর ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে ছবি সংরক্ষণ করা আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা এক বিষয় নয়। তবে Shared Album, Link sharing বা Partner sharing চালু থাকলে নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা ছবি দেখতে পারেন। ক্লাউডে শিশুর ছবি রাখলে অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা এবং শেয়ারিং সেটিংস নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত।
৩. স্কুলের অনুষ্ঠানে শিশুর ছবি প্রকাশ করতে না চাইলে কী করবেন?
অনুষ্ঠানের আগে স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের ছবি তোলা ও প্রকাশের নীতি জানতে চান। ছবি কোথায় প্রকাশ করা হবে এবং অভিভাবকদের অনুমতি নেওয়ার ব্যবস্থা আছে কি না, তা পরিষ্কার করুন। সন্তানের ছবি প্রকাশে আপত্তি থাকলে কর্তৃপক্ষকে আগেই লিখিতভাবে জানানো ভালো। ইতিমধ্যে ছবি প্রকাশিত হলে সেটি সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করতে পারেন।
৪. ভুল করে শিশুর ব্যক্তিগত তথ্যসহ ছবি পোস্ট করলে প্রথমে কী করবেন?
ছবিতে স্কুলের পরিচয়পত্র, বাড়ির ঠিকানা বা অন্য স্পর্শকাতর তথ্য দেখা গেলে দ্রুত পোস্টটি সরিয়ে ফেলুন অথবা দৃশ্যমানতা সীমিত করুন। সংশোধিত ছবি প্রকাশ করতে চাইলে ব্যক্তিগত তথ্য বাদ দিন। অন্য কেউ ছবিটি শেয়ার করে থাকলে তাঁকে সেটি সরিয়ে নিতে বলুন। তবে মূল পোস্ট মুছে ফেললেও আগে সংরক্ষিত কপি পুরোপুরি সরানো সম্ভব নাও হতে পারে।
৫. শিশুর ছবি অন্য কেউ শেয়ার না করার অনুরোধ কীভাবে জানাবেন?
পরিবারের সদস্য ও পরিচিত ব্যক্তিদের সরাসরি জানিয়ে দিন, অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া শিশুর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা যাবে না। স্কুলের অনুষ্ঠান, জন্মদিন বা পারিবারিক আয়োজনের আগেও বিষয়টি জানানো যেতে পারে। শিশুর গোপনীয়তা রক্ষার জন্য এই অনুরোধ করা স্বাভাবিক। কেউ অনিচ্ছাকৃতভাবে ছবি প্রকাশ করলে প্রথমে সেটি সরিয়ে নিতে বলুন।

